আমেরিকার শিকাগো থেকে সান্তা মনিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক রুট ৬৬-এর কথা শুনলেই অনেকের চোখে ভাসে দীর্ঘ সড়কের ধুলোবালি আর নস্টালজিক সব দৃশ্য। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন যে, আমেরিকার এই কিংবদন্তিতুল্য সড়কের নামটির জন্ম হয়েছিল মিসৌরির স্প্রিংফিল্ড নামক একটি ছোট শহরে। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালের ৩০ এপ্রিল স্প্রিংফিল্ডের তৎকালীন কলোনিয়াল হোটেলে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেই এই সড়কের সংখ্যাতত্ত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে রুট ৬৬-এর শতবর্ষ পূর্ণ হতে যাচ্ছে এবং এই উপলক্ষে স্প্রিংফিল্ড শহরটিকেই বৈশ্বিক উদযাপনের মূল কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯২০-এর দশকে আমেরিকার হাইওয়ে ব্যবস্থার জন্য কোনো নাম নয় বরং সংখ্যার খোঁজ করা হচ্ছিল। ওকলাহোমার হাইওয়ে কমিশনার সাইরাস অ্যাভেরি চেয়েছিলেন এই সড়কের নাম হোক ইউএস ৬০। কিন্তু কেনটাকির আপত্তির কারণে সেই সংখ্যাটি অন্য একটি রুটের জন্য বরাদ্দ করা হয়। বড় কোনো সংখ্যা না পাওয়ায় অ্যাভেরি বেশ হতাশ হয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় স্প্রিংফিল্ডের হোটেলে বসে মিসৌরির হাইওয়ে কর্মকর্তা বি এইচ পিপমায়ারের সঙ্গে এক টেলিগ্রামের মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, এই সড়কের নাম হবে ৬৬। তাদের মতে, ৬২ বা ৬০-এর চেয়ে ৬৬ সংখ্যাটি বেশি আকর্ষণীয় এবং মনে রাখা সহজ। সেই একটি টেলিগ্রামই আমেরিকার সড়ক সংস্কৃতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
রুট ৬৬ কেবল একটি রাস্তা নয়, এটি আমেরিকার বদলে যাওয়ার গল্প বলে। ১৯৩৯ সালে জন স্টেইনবেকের বিখ্যাত উপন্যাস দ্য গ্রেপস অফ র্যাথ-এ এই সড়কটিকে মাদার রোড হিসেবে অভিহিত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই রাস্তাটি আমেরিকানদের স্বাধীনতা এবং অবকাশ যাপনের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। স্প্রিংফিল্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই রাস্তাটি শহরের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোট ছোট ক্যাফে, সার্ভিস স্টেশন এবং মোটেল। আজও স্প্রিংফিল্ডে গেলে সেই সময়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। শহরের বিখ্যাত রেল হ্যাভেন মোটেলের একটি কক্ষ এলভিস প্রিসলির স্মৃতি বিজড়িত, যা পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সালে রুট ৬৬-এর শতবর্ষ উদযাপনের কিক-অফ অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে যাচ্ছে স্প্রিংফিল্ড থেকেই। দিনব্যাপী এই আয়োজনে থাকবে ক্লাসিক কার শো, বর্ণাঢ্য প্যারেড এবং ঐতিহাসিক আর্টফেস্ট টেলিগ্রাফ বল। এই বল ড্যান্সের মাধ্যমে ১৯২৬ সালের সেই ঐতিহাসিক টেলিগ্রাম পাঠানোর মুহূর্তটিকে স্মরণ করা হবে। শহরের ৮৩ বছর বয়সী বাসিন্দা এবং রুট ৬৬ কার মিউজিয়ামের মালিক গাই মেস জানান, গত কয়েক দশকে হাইওয়ে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হলেও স্প্রিংফিল্ড তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এখানকার পুরোনো সড়কগুলো এখনও সচল এবং আগের মতোই সতেজ।
বর্তমানে রুট ৬৬-এর অনেক অংশই আধুনিক হাইওয়ের নিচে চাপা পড়ে গেছে অথবা পরিত্যক্ত হয়েছে। তবে স্প্রিংফিল্ডে এলে পর্যটকরা এখনও আসল মাদার রোডের স্বাদ পান। গ্যারি’স গে প্যারিটা নামক একটি পুনর্নির্মিত সার্ভিস স্টেশন এবং হিস্ট্রি মিউজিয়াম অন দ্য স্কয়ার পরিদর্শন করলে এই রাস্তার স্বর্ণালি সময়ের ইতিহাস পরিষ্কার হয়ে ওঠে। শতবর্ষের এই আয়োজন কেবল আমেরিকার জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যারা এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এক বড় পাওনা। স্প্রিংফিল্ড এখন কেবল একটি শহর নয়, এটি বিশ্ব মানচিত্রে রুট ৬৬-এর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নতুন করে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
