হিমালয়ের কোলে অবস্থিত বিশ্বের শেষ বৌদ্ধ রাজতন্ত্রের দেশ ভুটান তার দীর্ঘদিনের `একাকীত্বের` খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসছে। দক্ষিণ ভুটানের গেলেফু শহরে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং একটি উচ্চাভিলাষী `মাইন্ডফুলনেস সিটি` নির্মাণের মাধ্যমে দেশটি পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে। ২০২৯ সালে চালু হতে যাওয়া এই বিমানবন্দরটি ভুটানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক নিজে গেলেফুর জঙ্গলে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্পের সূচনা করেছেন। বর্তমানে ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো পারো, যা বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত। পারো বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে এমন দক্ষ পাইলটের সংখ্যা বিশ্বে ৫০ জনেরও কম। এছাড়া সীমিত সংখ্যক ফ্লাইটের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে ভুটানে পৌঁছানো পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ ছিল। নতুন এই গেলেফু বিমানবন্দরটি সেই চিত্র বদলে দেবে।
এই প্রকল্পের প্রাণকেন্দ্র হলো `গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি` (GMC)। ১০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই শহরটি হবে বিশ্বের প্রথম `আধ্যাত্মিক অর্থনৈতিক অঞ্চল`। এখানে ইয়োগা, মেডিটেশন এবং সুস্থ জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করে অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ভুটানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে এই প্রকল্পের গভর্নর ড. লোটে শেরিং বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই শহরটি কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের ভুটানের দুর্গম দক্ষিণ অংশে টেনে আনবে।
ভুটান ঐতিহাসিকভাবেই `হাই ভ্যালু, লো ভলিউম` পর্যটন নীতি অনুসরণ করে। বর্তমানে পর্যটকদের প্রতিদিন ১০০ ডলার সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি (SDF) দিতে হয়। নতুন বিমানবন্দর ও শহর নির্মিত হলেও ভুটান তাদের এই নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। গেলেফু বিমানবন্দরটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যা ভুটানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীকে ফুটিয়ে তুলবে। এখানে বাঁশ ও কাঠের ব্যবহার প্রাকৃতিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং বিমানবন্দরের ভেতরেই থাকবে ধ্যানের বিশেষ ব্যবস্থা।
এছাড়া এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভারতের আসামের সাথে ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেল সংযোগ স্থাপন করা হবে, যা হবে ভুটানের ইতিহাসের প্রথম রেলওয়ে। এর ফলে ভারত থেকে সড়ক ও রেলপথে পর্যটকদের ভুটানে প্রবেশ আরও সহজ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তরুণ প্রজন্মের দেশত্যাগ রোধ করতে ভুটান এই বিশাল বিনিয়োগ করছে। ভুটানের এই নতুন উদ্যোগ বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হিমালয়ের লুকানো সৌন্দর্য দেখার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
