পবিত্র আল আকসা মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যেন সেখানে জুমার নামাজের জন্য জড়ো হতে না পারেন সেজন্য আগেভাগেই এই ঘোষণা দেওয়া হয়। দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ মসজিদে প্রবেশের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসনের এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম ইব্রাহিম জানিয়েছেন যে শুক্রবার জেরুজালেমের পুরান শহরের সব পবিত্র স্থান ইবাদতকারী ও পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আল আকসা মসজিদের পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন ওয়াল এবং চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকারও রয়েছে। কোনো সাধারণ মানুষ কিংবা পর্যটককে এসব পবিত্র এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা।
ইসলামে মসজিদের পবিত্রতা ও সেখানে ইবাদত করার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তার চেয়ে বড় জালেম আর কে, যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা প্রদান করে এবং সেগুলোকে বিরাণ করতে চেষ্টা করে?" (সূরা আল-বাকারা, ২:১১৪)। এই আয়াতের মর্মার্থ অনুযায়ী আল্লাহর ঘরে ইবাদতে বাধা দেওয়া একটি চরম অন্যায় হিসেবে বিবেচিত। অথচ বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে নামাজ আদায়ে এমন বাধা দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত বড় ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় ইসরায়েলি বাহিনী পুরো এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছে। এই পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৩০টিরও বেশি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
ফিলিস্তিনের দখলকৃত জেরুজালেমে অবস্থিত আল আকসা মসজিদ মুসলিম উম্মাহর অন্যতম পবিত্র স্থান। ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের পর থেকে জেরুজালেম দখল করে রাখার পর থেকেই এই এলাকাটিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সীমানা বাড়িয়ে চলেছে ইসরায়েল। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল আল আকসা নয় বরং খ্রিস্টানদের পবিত্র গির্জাতেও জনসাধারণের প্রবেশাধিকার রদ করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম ইব্রাহিম তার বক্তব্যে নিরাপত্তা রক্ষার দোহাই দিলেও ফিলিস্তিনিরা এটিকে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ওল্ড সিটির প্রবেশপথগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ ও স্নাইপার। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে শুক্রবার ভোর থেকেই জেরুজালেমের অলিগলিগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখলেও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে এখনো কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। ফিলিস্তিনিদের এই ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা কেবল তাদের ভূখণ্ডের জন্য নয় বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর আবেগের সাথে জড়িত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মুমিনরা এক ব্যক্তির মতো; যদি তার চোখে ব্যথা হয় তবে তার পুরো শরীরই ব্যথিত হয়" (সহীহ মুসলিম, ২৫৮৬)। জেরুজালেমের এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি এখন বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
