বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক আদেশে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে মোদী সরকার। বিশেষ করে আগামী মাসে ভারতের চারটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটারদের তুষ্ট রাখতে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এই বড় আর্থিক ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পেট্রোলের ওপর বিশেষ আবগারি শুল্ক প্রতি লিটারে ১৩ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের ক্ষেত্রে এই শুল্ক ১০ টাকা থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেস অ্যান্ড কাস্টমসের চেয়ারম্যান বিবেক চতুর্বেদী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে এই শুল্ক কমানোর ফলে প্রতি ১৫ দিনে সরকারের প্রায় ৭০ বিলিয়ন রুপি বা ৭৩৯ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হবে। তবে এই ক্ষতির একটি অংশ পুষিয়ে নিতে সরকার ডিজেল এবং এভিয়েশন ফুয়েল বা উড়োজাহাজের জ্বালানি রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপ করেছে। এই রপ্তানি শুল্ক থেকে সরকার প্রতি ১৫ দিনে প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুপি আয় করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট ভারতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান অভিমুখে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী যা দিয়ে ভারতের মোট আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ৪০ শতাংশ আসে তা প্রায় বন্ধের পথে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। ভারতের তেল মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জানান যে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে তেল সংস্থাগুলোর লিটার প্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। সরকার নিজের রাজস্বের ওপর বড় আঘাত সহ্য করে হলেও জনগণের ওপর সেই বোঝা চাপাতে চায়নি।
ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর এই সিদ্ধান্তের মিশ্র প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কায় ভারতের ১০ বছর মেয়াদী সরকারি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়ে ৬.৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে যা গত ২০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকার আগামী অর্থবছর থেকে জিডিপির ৪.৩ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি বজায় রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তা পূরণ করা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল বিপণন সংস্থাগুলো যারা ভারতের ৯০ শতাংশ খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের জন্য এই শুল্ক ছাড় বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। কারণ বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও অনেক সময় এই সংস্থাগুলো জনগণের কথা চিন্তা করে খুচরা বাজারে দাম বাড়াতে পারে না যার ফলে তাদের বিশাল অঙ্কের লোকসান গুণতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ। দেশটি তার প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে পেট্রোল ডিজেল বা জেট ফুয়েলের কোনো সংকট হবে না। তিনি বার্তা সংস্থা এএনআই-কে জানান যে সরকার তেল কোম্পানিগুলোকে সব ধরনের সহায়তা দেবে যাতে সাধারণ মানুষকে চড়া দাম দিতে না হয়। একইসঙ্গে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে বাণিজ্যিক ও শিল্প ক্ষেত্রে এলপিজি বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এর আগে ইরান যুদ্ধের শুরুতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য শিল্প খাতে সরবরাহ কমানো হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার সরকার স্পষ্ট করেছে যে গ্রীষ্মকালীন চাষাবাদের জন্য সারের জোগান এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কয়লার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একটি আলাদা বিবৃতিতে সাধারণ মানুষকে জানানো হয়েছে যে খুচরা পর্যায়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বর্তমানে অপরিবর্তিত থাকবে। উইন্ডফল ট্যাক্সের আওতায় ডিজেল রপ্তানির ওপর লিটার প্রতি ২১.৫ রুপি এবং এভিয়েশন ফুয়েলের ওপর ২৯.৫ রুপি কর নির্ধারণ করা হয়েছে যা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় রপ্তানিকারকদের ওপর প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে ভারত সরকার তার নিজস্ব কোষাগারের ওপর বড় ঝুঁকি নিয়ে হলেও জনগণের ক্ষোভ প্রশমন এবং অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
