রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

মোটিভেশন

মনের ভাষায় দোয়া কি কবুল হয়? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

মনের ভাষায় দোয়া কি কবুল হয়? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

দোয়ার ভাষা ও হৃদয়ের আকুতি । Ai ছবি

অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান জুমুআর দিনে বা বিশেষ কোনো ইবাদতের রাতে ইমাম সাহেবের সুনিপুণ আরবী দোয়া শুনে নিজের অযোগ্যতা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সুন্দর ছন্দে ও অলংকৃত আরবী শব্দে ইমাম যখন আল্লাহর কাছে চান, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে যে, তাদের সাধারণ বাংলা ভাষায় করা এলোমেলো বা অগোছালো দোয়াগুলো কি আদৌ আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় কি না। 

অনেকের আক্ষেপ থাকে যে তারা তাদের রবকে হয়তো সুন্দর করে ডাকতে পারছেন না। প্রকৃতপক্ষে এই চিন্তাটি শয়তানের এক সূক্ষ্ম ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। শয়তান চায় মানুষ এই হীনম্মন্যতায় ভুগে আল্লাহর কাছে চাওয়াটাই কমিয়ে দিক বা বন্ধ করে দিক। বাস্তব সত্য হলো মহান আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট ভাষার মুখাপেক্ষী নন, কারণ তিনি নিজেই সকল ভাষার স্রষ্টা। 

তিনি আরবী, বাংলা বা ইংরেজি সব ভাষাই যেমন বোঝেন, তেমনি তিনি সেই অব্যক্ত ভাষাও বোঝেন যা মানুষের ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই হৃদয়ের গভীরে ফিসফিস করে।

পবিত্র কুরআনের সূরা ক্বাফ-এ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা বা ফিসফিসানি দেয় তাও তিনি জানেন (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৬)। তিনি মানুষের শাহরগের চেয়েও নিকটবর্তী। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর কাছে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য অলংকৃত ভাষার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের একটি ঘটনা এই ধারণাকে আরও সুদৃঢ় করে। একবার এক গ্রাম্য বেদুইন রাসূল (সা.) এর কাছে এসে বিনয়ের সাথে স্বীকার করেন যে তিনি রাসূল (সা.) বা মুআয (রা.) এর মতো এত সুন্দর গুছিয়ে দীর্ঘ দোয়া করতে পারেন না। 

তিনি কেবল তাশাহহুদের পর জান্নাত চান এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি চান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন মুচকি হেসে তাকে আশ্বস্ত করে বলেন যে তারাও মূলত তাদের সব দোয়ায় এই জান্নাত এবং জাহান্নামের বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলেন। এই হাদিসটি সুনানে আবি দাউদ এবং ইবনে মাজাহ-তে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিচার করলে কখনো কখনো অগোছালো দোয়াই কবুলের জন্য বেশি কার্যকরী হয়। এর কারণ হলো যখন কেউ খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে, তখন সেখানে অনেক সময় লোকদেখানোর মনোভাব বা রিয়া চলে আসার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু যখন কোনো বান্দা নিজের অযোগ্যতা নিয়ে ভাঙা হৃদয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, তখন তার অন্তরে সর্বোচ্চ বিনয় ও অসহায়ত্ব কাজ করে। 

আলেমগণ উল্লেখ করেন যে আল্লাহ সেই বান্দাদের সাথে থাকেন যাদের অন্তর আল্লাহর জন্য ভেঙে গেছে। এমনকি সিজদায় পড়ে যখন কেউ যন্ত্রণার তীব্রতায় কোনো কথা বলতে পারে না, কেবল নীরবে চোখের পানি ফেলে—সেই অশ্রুসিক্ত নীরবতাও আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠতম দোয়া হিসেবে গণ্য হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে বলেছেন যে বান্দা সিজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে, তাই সেই সময় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।

দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে ভাষার চেয়ে বড় বাধা হলো বাহ্যিক আচরণ এবং জীবনের উপার্জন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন যিনি দীর্ঘ সফর করে ধূলি-ধূসরিত অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে প্রার্থনা করছেন, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় এবং পোশাক হারাম উপার্জনের। এই অবস্থায় তার দোয়া কবুল হওয়া অসম্ভব বলে রাসূল (সা.) সতর্ক করেছেন। 

এছাড়া সুনানে তিরমিযীর একটি হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ কোনো উদাসীন বা অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। সুতরাং দোয়া কবুলের পথে আসল অন্তরায় অগোছালো ভাষা নয় বরং হারাম রিজিক এবং গাফেল অন্তর। তাই একজন মুমিনের উচিত ভাষা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা এবং দোয়ার সময় হৃদয়ের পূর্ণ নিবিষ্টতা বজায় রাখা। আল্লাহর কাছে আপনার আন্তরিক আকুতি ও চোখের পানিই হলো পৌঁছানোর শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম।

banner
Link copied!