ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা রাশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কিটকো-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়া প্রায় ২২ হাজার কেজি বা ২১ দশমিক ৮ টন সোনা বিক্রি করেছে। দেশটির ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এবং যুদ্ধকালীন ব্যয় সামাল দিতেই ক্রেমলিন এই বিশাল পরিমাণ স্বর্ণ মজুত বাজারে ছেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশটির মোট স্বর্ণ মজুতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩০৪ দশমিক ৭৬ টন। তবে কেবল মার্চ মাসেই এই মজুত থেকে ৬ দশমিক ২২ টন সোনা কমেছে।
রাশিয়ার এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটির বিশাল অংকের বাজেট ঘাটতিকে। চলতি বছরের মার্চের শেষ নাগাদ রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা এবং সামরিক খাতে ব্যয়ের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ে আগের মতো প্রবৃদ্ধি না থাকায় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে এবং অভ্যন্তরীণ মুদ্রা রুবলের মান স্থিতিশীল রাখতে সোনা বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছে না মস্কো।
এদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারেও স্বর্ণের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মস্কো এক্সচেঞ্জ বা মোয়েক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সোনা লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫০ শতাংশ বেড়ে ৪২ দশমিক ৬ টনে পৌঁছেছে। রুবলের অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীরা এখন কাগজের মুদ্রার চেয়ে ধাতব স্বর্ণের ওপর বেশি ভরসা করছেন। লেনদেনের এই আর্থিক মূল্য ৫৩৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন রুবল ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০০ শতাংশ বেশি।
ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, রাশিয়া কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয় বরং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্বর্ণ রপ্তানি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চীনের বাজারে রাশিয়ার মূল্যবান ধাতুর রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা পিপলস ব্যাংক অব চায়না বিশ্বজুড়ে সোনা কেনার ক্ষেত্রে বর্তমানে বেশ সক্রিয়। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে সোনাভিত্তিক বাণিজ্য এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে এই রপ্তানির সিংহভাগই এখন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, শুধু রাশিয়া নয় বরং যুদ্ধ বা অস্থিরতার মধ্যে থাকা অনেক দেশই তাদের রিজার্ভ রক্ষা করতে সোনা বিক্রির পথ বেছে নেয়। তবে রাশিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু ভিন্ন কারণ দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা উৎপাদনকারী। উৎপাদন বেশি হলেও বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে সোনা কেনা বা মজুত বাড়ানোর সক্ষমতা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকটা কমে এসেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সোনা কেনার আগ্রহ বৃদ্ধি পেলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ঘাটতি মেটাতে সোনা বিক্রি অব্যাহত রাখা পুতিন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
