রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ জব্দ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: আইসিএস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ১২:০৪ এএম

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ জব্দ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: আইসিএস

পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ শিপিং (আইসিএস)। সংস্থাটি অবিলম্বে আটক জাহাজের ক্রু বা নাবিকদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইসিএস-এর সামুদ্রিক পরিচালক জন স্টপার্ট এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

স্টপার্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সমুদ্রপথে নিয়োজিত নাবিকদের অবশ্যই কোনো ধরনের নিপীড়ন ছাড়াই অবাধে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে মুক্ত নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের মূল নীতির পরিপন্থী। তার মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নিরীহ নাবিকদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইসিএস বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ বহরের প্রতিনিধিত্ব করে, ফলে তাদের এই সতর্কবার্তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর টোল বা শুল্ক আরোপের যে ইচ্ছা পোষণ করেছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্টপার্ট। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যদি হরমুজ প্রণালীতে এমন নজির স্থাপন করা হয়, তবে ভবিষ্যতে মালাক্কা প্রণালী বা জিব্রাল্টার প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোতেও একই ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের কাঠামোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি।

অন্যদিকে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নৌ-অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্টপার্ট বলেন যে, একদিকে ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালীটি কার্যত বন্ধ করে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন অবরোধ শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কোনো পক্ষই স্পষ্ট করছে না যে তাদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার মানদণ্ড কী, যার ফলে মাঝ সমুদ্রে জাহাজগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই দুটি করে বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে যে তারা ভারত মহাসাগরে ‍‍`ম্যাজেস্টিক এক্স‍‍` এবং ‍‍`টিফানি‍‍` নামক দুটি জাহাজ জব্দ করেছে, যেগুলোতে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ইরানি তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। এর বিপরীতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস পানামার পতাকাবাহী ‍‍`এমএসসি ফ্রান্সেসকা‍‍` এবং গ্রিক মালিকানাধীন ‍‍`এপামিনন্ডাস‍‍` জাহাজ দুটি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। ইরানের দাবি, জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই চলাচল করছিল এবং নেভিগেশন সিস্টেমে কারচুপি করার চেষ্টা করেছে।

ফিলিপাইন এবং মন্টিনিগ্রোর সরকারি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে তাদের বেশ কিছু নাগরিক এই আটক জাহাজগুলোতে রয়েছেন। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে নাবিকরা নিরাপদ আছেন এবং তাদের কোনো শারীরিক ক্ষতি করা হয়নি, তবে স্টপার্ট মনে করেন বিষয়টি কেবল শারীরিক নিরাপত্তার নয়। সাত সপ্তাহ ধরে কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় থাকা প্রায় ২০ হাজার নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই জলপথটি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা অনেক দেশকে জরুরি জ্বালানি সাশ্রয় নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা আগের তুলনায় নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে দৈনিক গড়ে ১২৯টি জাহাজ যাতায়াত করত, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে মাত্র ৫টি জাহাজ পারাপার হয়েছে বলে জানা গেছে।

banner
Link copied!