রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

মণিপুরে নতুন করে সহিংস বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ৩০

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

মণিপুরে নতুন করে সহিংস বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ৩০

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে। শনিবার রাজধানী ইম্ফলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। বিক্ষোভকারীরা সাম্প্রতিক বিভিন্ন সহিংস ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং রাজ্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে রাজপথে নামে। কো-অর্ডিনেটিং কমিটি অন মণিপুর ইন্টেগ্রিটি বা কোকোমি-র নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১টার দিকে ইম্ফলের অন্তত আটটি ভিন্ন স্থান থেকে একযোগে মিছিল শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিংয়ের সরকারি বাসভবন ঘেরাও করে স্মারকলিপি প্রদান করা। তবে মিছিলটি শহরের কেন্দ্রে পৌঁছালে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। বিশেষ করে ইম্ফল ওভারব্রিজ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী বেরিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আটকে দিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আন্দোলনকারীরা বেরিকেড ভেঙে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে দফায় দফায় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে প্রধান ছিল গত কয়েকমাসের সহিংসতায় নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার এবং বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত পুনর্বাসন। এ ছাড়া কুকি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সাসপেনশন অব অপারেশন’ বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবিও তুলেছেন কোকোমি-র নেতারা। তাদের অভিযোগ, এই চুক্তির আড়ালে বিদ্রোহীরা সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। সংগঠনটি আরও দাবি করেছে যে, মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

সংঘর্ষের রেশ ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহাসিক ইমা কেইথেল বা নারী বাজার এবং আলু গলি এলাকাতেও। পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের আঘাতে অনেক বিক্ষোভকারী জ্ঞান হারান এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে নিকটস্থ রিমস ও অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় বেশ কিছু বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইম্ফল শহরের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দাস কনথৌজাম। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, সরকার আলোচনার জন্য একাধিকবার কোকোমি নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে আন্দোলনকারীরা আলোচনায় অংশ না নিয়ে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে। মন্ত্রীর দাবি, সরকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে বদ্ধপরিকর। তবে বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

মণিপুরে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে। মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সেই ভয়াবহ সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও দীর্ঘ সময় পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ প্রমাণ করছে যে রাজ্যের অস্থিরতা এখনো কাটেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উদাসীনতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা মণিপুরকে আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজকের এই সংঘর্ষ রাজ্যজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

banner
Link copied!