আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার ক্ষত আজও শুকায়নি। চেরনোবিলের সেই চতুর্থ রিয়্যাক্টর থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় মেঘ ইউক্রেন, বেলারুশ ও রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ইউরোপে।
সেই বিপর্যয়ে সরাসরি অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হলেও পরবর্তী দশকগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে কয়েক হাজার মানুষ ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আক্রান্ত অঞ্চলে জন্মগত ত্রুটির হার বেড়েছিল প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ শতাংশ।
আজ সেই ধ্বংসযজ্ঞের চার দশক পেরিয়ে এসে বিশ্ব যখন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের মুখোমুখি, তখন বিশেষজ্ঞরা আবারও একটি পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। তবে তারা একইসঙ্গে এই ঝুঁকি থেকে মুক্তির পথ হিসেবে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার কথা বলছেন।
বর্তমানে ইউক্রেন ও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা চেরনোবিলের দুঃস্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে আসছে। ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবৈধ দখল এবং চেরনোবিলের সুরক্ষা কাঠামোর ওপর ড্রোন হামলা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে ইরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অত্যন্ত কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা নিশ্চিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বড় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যুদ্ধের সময় সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এই ধরনের স্থাপনায় কোনো দুর্ঘটনা বা পরিকল্পিত হামলা কেবল একটি দেশের জন্য নয় বরং পুরো বিশ্বের জন্য দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
পারমাণবিক শক্তির পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতাও বিশ্বকে একটি বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরান ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত বাণিজ্যিক রুটগুলো যখন যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে পরিবহণ ও খাদ্যের দাম পর্যন্ত। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বা উত্তেজনা বিশ্বের অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো উৎসগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সময় দেখা গেছে যে, যখন কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল তখন বিকেন্দ্রীভূত সোলার ও ব্যাটারি সিস্টেমগুলো হাসপাতাল ও স্কুলের মতো জরুরি সেবা চালু রাখতে সাহায্য করেছে। এই ব্যবস্থাগুলো দ্রুত স্থাপন করা যায় এবং শত্রুপক্ষের জন্য এগুলো পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া কঠিন। কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও চেরনোবিলের মতো কোনো তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকে না। বাতাস বা সূর্যের আলো কোনো যুদ্ধজাহাজ বা পাইপলাইনের মাধ্যমে আসে না যে তাকে অবরোধ করা যাবে।
তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ এখানে নেই। চেরনোবিল বিপর্যয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পেছনে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবেন নাকি একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল আগামীর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির পথে হাঁটবেন।
