রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমতে পারে: ঘোর সংকটে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩, ২০২৬, ১২:০২ এএম

উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমতে পারে: ঘোর সংকটে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা

বিশ্ব এক নজিরবিহীন খাদ্য সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। এই পথটি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে ফসলের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বরাতে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দ্রুত এই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল না হয়, তবে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্ব এক চরম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি কেবল জ্বালানি তেলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং এটি সার তৈরির কাঁচামাল এবং তৈরি সার পরিবহনেরও একটি প্রধান ধমনী। ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা শক্তির সামরিক তৎপরতা শুরুর পর থেকে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে সারের আকাশচুম্বী দাম ও তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কৃষি বিশ্লেষকদের মতে সারের অভাবে বৈশ্বিক ফসল উৎপাদন অন্তত ৩০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর কোনো বিকল্প পথ বা উৎস এই মুহূর্তে কৃষি বিশ্বের হাতে নেই। এই সংকটটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্বের অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই খাদ্য উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরিও এই পরিস্থিতির গভীরতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে আমরা এখন সময়ের সঙ্গে এক অসম দৌড়ে লিপ্ত হয়েছি। কৃষিকাজে ফসল রোপণ ও ফসল তোলার একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার থাকে যা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এশিয়ার অনেক দেশে ইতিমধ্যে বীজ বপনের প্রধান মৌসুম পার হয়ে গেছে। সারের অভাবে কৃষকরা হয় চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন অথবা পর্যাপ্ত সার ছাড়া অত্যন্ত নিম্নমানের ফলন পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন। তোরিও স্পষ্ট করে বলেছেন যে পরিস্থিতি এখন আর কেবল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই বরং এটি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই সংকটের প্রভাব কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নয় বরং উন্নত বিশ্বের কৃষিতেও বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো এখন তাদের চাষাবাদের ধরন বদলে ফেলছে। এই দেশগুলো এখন এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছে যেগুলোতে নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন কম হয়। যেমন তারা গম ও ভুট্টা চাষ কমিয়ে সয়াবিন চাষের দিকে মন দিচ্ছে। কারণ সয়াবিন গাছ বাতাস থেকে নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে ধরে রাখতে পারে যা বাড়তি সারের প্রয়োজনীয়তা কমায়। তবে এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববাজারে গম ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যাপক হারে কমে যাবে যা সরাসরি রুটি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে।

জ্বালানি তেলের লাগামহীন দাম এই সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন তেলের দাম বাড়ে তখন সারের উৎপাদন খরচও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। কারণ কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস ও শক্তির প্রয়োজন হয়। এখন অনেক কৃষক তাদের সীমিত সম্পদ বাঁচাতে খাদ্যশস্যের বদলে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের উপযোগী ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এটি একটি ভয়ানক প্যারাডক্স তৈরি করছে। মানুষ যখন খাদ্যের অভাবে ধুঁকছে তখন আবাদি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে গাড়ির জ্বালানি তৈরির জন্য। ম্যাক্সিমো তোরিও সতর্ক করেছেন যে গমের দাম ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।

২০২৬ সালের দ্বিতীয় ভাগ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে জাতিসংঘের এই অর্থনীতিবিদ মনে করছেন। আমরা বর্তমানে যে খাবার গ্রহণ করি তার দাম কেবল কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে না বরং এর সঙ্গে প্যাকিং, পরিবহন ও জ্বালানি খরচ যুক্ত থাকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে চাল, ডাল, গম ও সয়াবিন তেলের দাম এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে যা ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। এটি নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য এই বার্তাটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেখানে কৃষি উৎপাদন সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল সেখানে সারের ঘাটতি মানেই হলো ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া। যদি উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যায় তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে খাদ্য আমদানি করতে হবে। কিন্তু বিশ্ববাজারে তখন খাদ্যের প্রাপ্যতা হবে অত্যন্ত সীমিত এবং দাম হবে আকাশচুম্বী। এর ফলে কেবল খাদ্য সংকট নয় বরং পুরো অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দা নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ঘুরছে। প্রতিটি দিন পার হওয়া মানেই হলো একটি রোপণ মৌসুম হারানো। হরমুজ প্রণালির এই অবরোধ কেবল একটি সামরিক কৌশল নয় বরং এটি কোটি কোটি মানুষের পেটে লাথি মারার শামিল। যদি বিশ্বনেতারা দ্রুত একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তবে যুদ্ধক্ষেত্রে যত মানুষ মারা যাবে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যাবে না খেয়ে। এই সংকট নিরসনে সারের সরবরাহ লাইন সচল রাখা এবং কৃষি বিশ্বকে যুদ্ধের রাজনীতির বাইরে রাখার কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের মেঘ কেবল ঘনীভূত হচ্ছে। সারের উচ্চমূল্য, উৎপাদন হ্রাস এবং প্রধান রপ্তানিকারকদের ফসল পরিবর্তনের এই ত্রিমুখী আঘাত বিশ্বকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের এই হুঁশিয়ারি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় বরং এটি একটি জরুরি আহ্বান যাতে এখনই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্যথায় ২০২৭ সাল হবে মানব ইতিহাসের অন্যতম করুণ একটি বছর যেখানে প্রাচুর্যের মাঝেও মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরণ করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কৃষি ক্যালেন্ডার কারো জন্য অপেক্ষা করে না এবং প্রকৃতির এই চক্র একবার ভেঙে পড়লে তা পুনরুদ্ধার করা হবে এক দুঃসাধ্য লড়াই।

banner
Link copied!