দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বের সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে আসছিলেন যে নিষেধাজ্ঞা কোনো রাষ্ট্রের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে না বরং তা সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার কেবল বেড়েছে। বর্তমান সময়ে ইরান-ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই যুদ্ধই মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কাঠামোটিকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তেহরান এখন ডলারের বিকল্প হিসেবে বিটকয়েন, চীনা রেনমিনবি এবং প্রাচীন হাওলা পদ্ধতির মতো বিকল্প আর্থিক স্থাপত্য ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার জাল ছিঁড়ে বের হয়ে আসছে যা আগে কখনো এত শক্তিশালীভাবে দেখা যায়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মুদ্রার বৈশ্বিক আধিপত্যকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো সাধারণত ডলারের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারে না বলে তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থমকে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রসার এই সমস্যার এক অভাবনীয় সমাধান নিয়ে এসেছে। ব্লকচেইন তথ্য প্ল্যাটফর্ম চেইনঅ্যানালাইসিসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সত্তাগুলোর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালে যেখানে এই প্রবাহ ছিল ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে তা ৬৯৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো গত বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রাপ্ত মোট অর্থের অর্ধেকই ছিল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর্পস বা আইআরজিসি-র দখলে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার।
ইরান মূলত তাদের অর্জিত ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোকে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে রূপান্তর করে এবং তা দিয়ে রাশিয়ার পণ্য ক্রয় বা এশিয়ার অন্যান্য বাজারে বাণিজ্য পরিচালনা করে। এই প্রক্রিয়াটি কেবল নিষেধাজ্ঞাই এড়াচ্ছে না বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় রেনমিনবির অবস্থানকেও শক্তিশালী করছে। বর্তমানে চলা যুদ্ধের কারণে অনেক অর্থনৈতিক শক্তি এখন ইরানের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে।
তেহরান যখন বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের ট্রানজিট পয়েন্ট হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা জাহাজ চলাচলের জন্য ট্রানজিট টোল বা মাশুল দাবি করতে শুরু করে। এই মাশুলের পরিমাণ ছিল ব্যারেল প্রতি কমপক্ষে ১ ডলার যা বিটকয়েন বা রেনমিনবিতে পরিশোধ করতে হতো। বিটকয়েন সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় এটি কোনো একক দেশ বা সংস্থা জব্দ করতে পারে না যা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে।
ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর এই প্রক্রিয়া বা ডি-ডলারাইজেশন কেবল ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চীন বর্তমানে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং তারা তাদের নিজস্ব মুদ্রায় এই মূল্য পরিশোধ করছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চীনের বহিঃবাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ তাদের নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর মাশুল আদায়ের পদ্ধতিটি অনেক রাষ্ট্রকে রেনমিনবি ব্যবহারের দিকে উৎসাহিত করছে কারণ ডলারের রাজনৈতিক ঝুঁকি এখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন তার মিত্র বা শত্রু সবার বিরুদ্ধেই ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন অন্য দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিকল্পের সন্ধানে নামে। এই যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা অনেক দেশকে ডলারের বিকল্প আর্থিক স্থাপত্যে যোগ দিতে বাধ্য করছে।
এই দৃশ্যমান অর্থনীতির নিচে কাজ করছে আরও একটি প্রাচীন এবং শক্তিশালী মাধ্যম যা হলো হাওলা নেটওয়ার্ক। হাওলা পদ্ধতিতে কোনো অর্থের শারীরিক চলাচল ছাড়াই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অর্থ স্থানান্তর করা যায়। ইরানের ক্ষেত্রে এটি মূলত বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত শেল কোম্পানি বা ছদ্মনামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থাটি কেবল নিষেধাজ্ঞাই এড়ায় না বরং আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই প্রক্রিয়ার অংশীদার বানিয়ে ফেলে।
যখন কোনো দেশ হাওলা বা বার্টার বাণিজ্যের মাধ্যমে ইরানের সাথে যুক্ত হয়, তখন তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ তেহরানের সাথে জড়িয়ে যায়। এর ফলে ওই দেশগুলো আর মার্কিন চাপের মুখে ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না বরং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার বৈশ্বিক অংশীদার হয়ে ওঠে।
বার্টার বা পণ্য বিনিময় ব্যবস্থাও ইরান যুদ্ধের মধ্যে নতুন মাত্রা পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ইরান এবং শ্রীলঙ্কার মধ্যে চা আমদানির বিনিময়ে ঋণ পরিশোধের চুক্তি রয়েছে। একইভাবে পাকিস্তান ও ভারতের সাথেও ইরান তেল বিনিময়ে চাল বা শিল্পজাত পণ্য আমদানির পরিকল্পনা করছে। রাশিয়ার সাথে এই ধরনের বিনিময় বাণিজ্য আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এই পদ্ধতিগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকে যার ফলে মার্কিন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ভয় থাকে না। ইরান এখন হরমুজ প্রণালী থেকে অর্জিত টোল বা মাশুলকে পণ্যে রূপান্তর করে তা এশিয়া এবং ইউরোপের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যা একটি বিকল্প যুদ্ধকালীন অর্থনীতির জন্ম দিচ্ছে।
অবশ্য ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। বর্তমানে বৈশ্বিক তেলের লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশ এখনো ডলারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় এবং বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ শতাংশই হলো ডলার। বিপরীতে রেনমিনবির হার মাত্র ২ শতাংশ কারণ চীনের পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এটিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত রিজার্ভ মুদ্রা হতে বাধা দেয়।
তবে ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে যা ঘটছে তা হলো ডলারের হ্যামিল্টনীয় আধিপত্যের ধীরগতির ক্ষয়। মার্কিন-ইসরায়েলি রণকৌশল ইরানকে একঘরে করার বদলে উল্টো দেশটিকে একটি আন্তর্জাতিক ‘এক্সিস অফ ইভেশন’ বা বর্জন অক্ষের কেন্দ্রে বসিয়ে দিয়েছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চেয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অস্ত্রটিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শেষ পর্যন্ত ডলারের এই হেজিমনি বা একচ্ছত্র আধিপত্যই হয়তো এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হবে।
