রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ছয় দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে ওপেক ছাড়ল ইউএই: নেপথ্যে সৌদি আরবের সাথে দ্বন্দ্ব?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

ছয় দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে ওপেক ছাড়ল ইউএই: নেপথ্যে সৌদি আরবের সাথে দ্বন্দ্ব?

প্রায় ছয় দশক ধরে ওপেকের (OPEC) সদস্য থাকার পর আকস্মিকভাবেই তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর এই প্রভাবশালী জোট ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। মঙ্গলবার জেদ্দায় গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (GCC) একটি জরুরি শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে আবুধাবি এই বিস্ময়কর সিদ্ধান্তটি সামনে আনে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সবেমাত্র এই সম্মেলন শুরু করার জন্য নিজের আসনে বসেছিলেন, ঠিক তখনই আমিরাতের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে ওপেককে নিজেদের কৌশলগত ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। আমিরাতের কাছে এই জোটটি ধীরে ধীরে একটি ‍‍`খাঁচায়‍‍` পরিণত হয়েছিল, যা তাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাত মূলত ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ তাদের আর এই জোটের প্রয়োজন নেই। উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেও, আবুধাবি সেটি বাস্তবে রূপ দিয়েছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে আমিরাতের তেলবহির্ভূত জিডিপি তাদের মোট বাস্তব উৎপাদনের ৭৭.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এই একটি পরিসংখ্যানই ওপেকের মতো একটি তেল-কেন্দ্রিক জোট থেকে তাদের বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা দেয়।

আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি অ্যাডনক (ADNOC) ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তারা চাইছে তেলের বর্তমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজস্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু ওপেকের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী আমিরাতকে দৈনিক মাত্র ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে হতো। অন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এই কোটা আমিরাতের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছিল।

অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি রিয়াদের সাথে আবুধাবির ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বও এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইয়েমেন যুদ্ধে দুই দেশ বিপরীতমুখী পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং ওপেকের কোটা নিয়ে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে। চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো নিল কুইলিয়ামের মতে, আমিরাত চায় না ওপেক বা রিয়াদের কারণে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হোক।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বাজেট ঘাটতি এড়াতে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯০ ডলার হওয়া প্রয়োজন, যেখানে আমিরাতের প্রয়োজন ৫০ ডলারেরও কম। এই বিশাল পার্থক্য দুই দেশের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশকে একেবারেই আলাদা করে দিয়েছে। আমিরাত এখন নিজেদের বাণিজ্য, অর্থায়ন, পর্যটন এবং প্রযুক্তির একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো কারেন ইয়াং রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আমিরাতের এই বিদায় মূলত তাদের বিস্তৃত কৌশলের অংশ। তারা নিজেদের সুবিধামতো তেল, গ্যাস বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারে সরবরাহ করতে চায়।

এদিকে, এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেই অঞ্চলটিতে অন্য সংকটগুলোও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে। এই প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন কেবলগুলোও এখন হুমকির মুখে, যা এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যেই ১১১ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ৬১ ডলার মূল্যে অতিরিক্ত ১২ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করে আমিরাত বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারত, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই বিপুল রাজস্ব সংগ্রহও এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে, যেখানে পুরোনো জোটের আর কোনো স্থান নেই।

banner
Link copied!