ইসলামিক ইতিহাসে সততা এবং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে যার একটি বিশেষ অংশ জুড়ে আছে বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এমন এক ব্যক্তির কাহিনী বর্ণনা করেছেন যার ঋণ পরিশোধের অলৌকিক ঘটনা আজও মুমিনদের হৃদয়ে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এক অনন্য প্রেরণা জোগায়। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় জানা যায়, বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি তার এক পরিচিত লোকের কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার চেয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে বড় অংকের লেনদেনে সাক্ষী বা জামিনদার রাখার প্রচলন ছিল। কিন্তু এই লেনদেনের ক্ষেত্রে সাক্ষী ও জামিনদার হিসেবে কোনো মানুষকে নয়, বরং খোদ সৃষ্টিকর্তাকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল।
লেনদেনের সেই মুহূর্তে ঋণদাতা যখন সাক্ষী চাইলেন, তখন ঋণগ্রহীতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। একইভাবে জামিনদারের ক্ষেত্রেও তিনি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেন। ঋণদাতার অন্তরেও ছিল অগাধ ইমান, তাই তিনি মানুষের পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে কোনো দৃশ্যমান সাক্ষী ছাড়াই এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার দেন। শর্ত ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই অর্থ ফেরত দিতে হবে। এরপর ঋণগ্রহীতা সেই অর্থ নিয়ে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমান। তিনি তার কাজ শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওনাদারের কাছে পৌঁছানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো নৌকা বা যানবাহন খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন।
নির্ধারিত সময় যখন ঘনিয়ে এলো, তখন ঋণগ্রহীতা এক চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়লেন। একদিকে তার সততা এবং অঙ্গীকার রক্ষার তাগিদ, অন্যদিকে কোনো উপায় না থাকা। এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি একটি অভাবনীয় কাজ করলেন। তিনি একটি কাঠের টুকরো সংগ্রহ করে তা ছিদ্র করলেন এবং তার ভেতরে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও একটি চিঠি ভরে মুখটি ভালো করে বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বললেন যে হে আল্লাহ, তুমি জানো আমি তোমার নামেই এই ঋণ নিয়েছিলাম এবং তুমিই ছিলে এর জামিনদার। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো বাহন পাইনি, তাই এই অর্থ আমি তোমার কাছেই আমানত রাখছি। এই বলে তিনি কাঠের টুকরোটি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিলেন।
আল্লাহর কুদরত বা অলৌকিক ক্ষমতা ঠিক সেই মুহূর্তেই কাজ শুরু করল। সমুদ্রের ঢেউ সেই কাঠের টুকরোটিকে বহন করে নিয়ে চলল ঋণদাতার শহরের দিকে। ওদিকে নির্দিষ্ট দিনে ঋণদাতা সমুদ্রের তীরে এসে অপেক্ষা করছিলেন এই আশায় যে হয়তো ঋণগ্রহীতা কোনো জাহাজে করে আসবেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন কোনো জাহাজ দেখা গেল না, তখন তার নজরে পড়ল সৈকতে ভেসে আসা একটি সাধারণ কাঠের টুকরো। তিনি ভাবলেন এটি অন্তত জ্বালানি কাঠ হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে যখন তিনি কাঠটি চেরার চেষ্টা করলেন, তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। কাঠের ভেতর থেকে ঝকঝকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং সেই চিঠিটি বেরিয়ে এল।
বেশ কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা যখন অন্য একটি জাহাজে করে পুনরায় এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে পাওনাদারের কাছে পৌঁছালেন, তখন তিনি তার দেরির জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানালেন যে তিনি নির্দিষ্ট সময়ে আসার জন্য কত কষ্ট করেছিলেন কিন্তু কোনো জাহাজ পাননি। তখন ঋণদাতা মুচকি হেসে তাকে জানালেন যে তার আর নতুন করে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি যে অর্থ আল্লাহর জিম্মায় সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, তা আল্লাহ সহীহ-সালামতে তার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ঋণদাতা ঋণগ্রহীতাকে তার নিয়ে আসা নতুন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাসহ খুশি মনে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন (সহীহ আল-বুখারী, ২২৯১)।
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে যখন কোনো বান্দা পূর্ণ ইখলাস বা নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তখন আল্লাহ তার জন্য এমন সব উৎস থেকে সাহায্যের দরজা খুলে দেন যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। ব্যবসায়িক সততা এবং ওয়াদা পালনের এই দৃষ্টান্ত বর্তমান সময়ের প্রতিটি মুসলিমের জন্য একটি অনুসরণীয় আদর্শ। এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং মুমিনের কারামত বা অলৌকিকত্বের এক বাস্তব প্রমাণ যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসীদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করলে যে কোনো বিপদেই উদ্ধার পাওয়া সম্ভব, এই হাদিসটি তারই এক জীবন্ত দলিল।
