চীনে তীব্র পারিবারিক প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়া তরুণ প্রজন্ম নিজেদের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে অনলাইন ‘ভার্চুয়াল বাবা-মা’র তৈরি ভিডিওর দিকে ঝুঁকছে বলে রবিবার হংকং থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি নিউজ। সাংহাইয়ের বাসিন্দা এবং পেশায় প্রযুক্তি কর্মী ৩৩ বছর বয়সী ভিনসেন্ট ঝাং প্রতিদিন দুপুরের খাবারের সময় নিজের মুঠোফোন বের করে এই ভার্চুয়াল বাবা-মার খোঁজ নেন। ডুইন নামের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ অনুসারী থাকা প্যান হুচিয়ান এবং ঝাং শিউপিং নামের এক মধ্যবয়সী দম্পতি এই ধরণের কন্টেন্ট তৈরি করে চীনের তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাদের ভিডিওর নিচে হাজার হাজার তরুণ মন্তব্য করে নিজেদের জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প ভাগ করে নেন এবং জন্মদিনের আশীর্বাদ চান। চীনের এই নতুন সামাজিক প্রবণতাটি দেশটির বর্তমান পারিবারিক কাঠামো এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি বিশেষ সংকটময় দিক উন্মোচন করেছে যা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের মাঝে বেশ চর্চা হচ্ছে।
পারিবারিক বন্ধন এবং কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার তীব্র চাপের কারণে চীনের বর্তমান যুবসমাজ এক ধরণের গভীর মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন। ভিনসেন্ট ঝাং জানান যে তার নিজের বাবা-মা কখনো তাকে বলেন না যে তিনি যথেষ্ট ভালো করছেন বা নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ না নিতে। বরং প্রতি সপ্তাহে যখন তিনি বাড়িতে ফোন করেন, তখন তার কর্মজীবন, সরকারি চাকরির স্থায়িত্ব এবং বিয়ে না করা নিয়ে ক্রমাগত সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। ফোনের ওপাশ থেকে আসা অনবরত তিরস্কারের কারণে নিজের বাড়ি থেকে দূরে থাকা এই তরুণ সামাজিক মাধ্যমের ছদ্মবেশী বাবা-মার মাঝে এক ধরণের কৃত্রিম ভালোবাসা ও সান্ত্বনা খুঁজে পান। কন্টেন্ট নির্মাতা প্যান হুচিয়ান নিজেও এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে শৈশবে নিজের পক্ষাঘাতগ্রস্ত মায়ের কারণে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল এবং তিনিও কখনো পরিবারের কাছ থেকে কোনো উৎসাহ পাননি। নিজের জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি তার নিজের মেয়ের সাথে সবসময় ভালোবাসার সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং সামাজিক মাধ্যমেও অন্য সন্তানদের প্রতি স্নেহের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন যেন অন্য কেউ এমন একাকীত্বে না ভোগে।
এই সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে চীনের বিগত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক উত্থান এবং সাম্প্রতিক মন্দা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। চীনের বর্তমান তরুণদের দাদা-দাদিরা ১৯৫১-এর দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৬০-এর দশকের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো চরম সংকটকাল পার করেছেন এবং তাদের বাবা-মাও এক উন্নয়নশীল দেশে বড় হয়েছেন। এর বিপরীতে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এক উন্নত ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো দেখলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর থেকে চীনে যুব বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় তরুণদের মাঝে কর্মসংস্থান নিয়ে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই সমাজে টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন এবং সনাতন ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলো তরুণদেরকে প্রথাগত পারিবারিক দায়িত্ব ও পিতৃভক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানালেও তা নতুন প্রজন্মকে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারছে না কারণ তাদের মানসিক চাহিদার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই কৃত্রিম সম্পর্কগুলো দীর্ঘমেয়াদে তরুণদের বাস্তব জীবনের সামাজিক দক্ষতাকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং পারিবারিক দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা। চীনের ইন্টারনেট দুনিয়ায় বর্তমানে ‘গোর্ড সুপ লিটারেচার’ বা লাউয়ের সুপ সাহিত্য নামের একটি নতুন মিম বা কৌতুক চিত্র অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা বাবা-মার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং সন্তানদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তকে ফুটিয়ে তোলে। ২৮ বছর বয়সী ঝাও শুয়ান নামের এক তরুণী জানান যে তার নিজের পরিবারে এই ধরণের মানসিক চাপের কারণে তিনি পারিবারিক যোগাযোগের গ্রুপটি সম্পূর্ণ বন্ধ বা মিউট করে রেখেছেন। তিনি এখন নিজের দুঃখ প্রকাশের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের এই রসাত্মক মিমগুলোর সাহায্যেই নিজের মানসিক অবস্থাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তার মায়ের সনাতন মানসিকতার পরিবর্তন সহজে হবে না। এই ধরণের প্রতীকী প্রতিরোধ চীনের ঘরে ঘরে তৈরি হওয়া একটি নীরব পারিবারিক বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
সামাজিক ও পারিবারিক গবেষকদের মতে, চীনের তরুণদের এই আচরণ এক ধরণের সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অনেকেই ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই মায়া জড়ানো কথাগুলোকে বাস্তব জীবনের শূন্যতা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন যা তাদের পরিবার থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এই ধরণের কন্টেন্ট নির্মাতারা প্রতিনিয়ত তাদের ভিডিওতে সহানুভূতিশীল কথাবার্তা বললেও এর পেছনে বিশাল একটি বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের উদ্দেশ্য জড়িত থাকে। তরুণরা যখন এই রূঢ় বাস্তবতাকে এড়িয়ে কেবল ডিজিটাল সান্ত্বনার পেছনে ছোটেন, তখন তা তাদের বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। ফলে চীনের এই তরুণ প্রজন্মের মাঝে দীর্ঘমেয়াদে গভীর একাকীত্ব এবং সমাজবিমুখতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে যা দেশটির ভবিষ্যৎ সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সাংহাইয়ের প্রযুক্তি কর্মী ভিনসেন্ট ঝাং মনে করেন যে এই ভার্চুয়াল বাবা-মার ভিডিওগুলো তাকে শৈশবের সেই সহজ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় যখন কোনো সামাজিক চাপ ছাড়াই তিনি পরিবারের সাথে কেনাকাটা করতে যেতে পারতেন। পূর্বে উল্লিখিত প্যান হুচিয়ানের ভিডিওগুলো দেখার মাধ্যমে তিনি তার জীবনের একাকীত্ব কাটানোর একটি বড় উৎস খুঁজে পেয়েছেন। তিনি খুব ভালো করেই জানি যে এই কন্টেন্টগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একটি বড় বাণিজ্যিক সফলতার উদ্দেশ্য জড়িত রয়েছে, তবুও তিনি সেখানে কিছুটা স্বস্তি পান। তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি শেষে চীনের বহু তরুণ এভাবেই প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমের পর্দায় কৃত্রিম মা-বাবার কাছ থেকে একটু স্নেহের বাণী শুনে নিজেদের একাকীত্ব দূর করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন যা আধুনিক নগর জীবনের এক জটিল বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
