গ্রীষ্মের এই তীব্র গরমে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ ছাড়াই ঘরোয়া পদ্ধতিতে দীর্ঘ মেয়াদে আম সংরক্ষণ করার বেশ কিছু প্রাচীন ও আধুনিক প্রাকৃতিক উপায় শনিবার উম্মাহ কণ্ঠের লাইফস্টাইল ডেস্ক বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছে। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের মধ্যে জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের আম খাওয়ার উৎসব অন্যতম একটি লোকজ ঐতিহ্য হিসেবে টিকে রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাগান থেকে শুরু করে শহরের কাঁচাবাজার পর্যন্ত সর্বত্র এখন ফলের রাজা আমের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে এবং সব বয়সী মানুষ এই মৌসুমি ফলের স্বাদ নিতে উন্মুখ হয়ে থাকেন। তবে শহর অঞ্চলের মেস বা ব্যাচেলর বাসায় বসবাসকারী শিক্ষার্থী ও চাকুরিজীবী যাদের ঘরে ফ্রিজ নেই কিংবা যারা লোডশেডিংয়ের কারণে রেফ্রিজারেটরের কৃত্রিম ঠান্ডার ওপর ভরসা করতে পারছেন না তাদের জন্য একসাথে বেশি পরিমাণ আম ঘরে আনা একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেফ্রিজারেটরের কৃত্রিম ঠান্ডা অনেক সময় আমের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া চমৎকার সুবাস এবং আসল মিষ্টি স্বাদকে সম্পূর্ণ ফিকে করে দেয় যা সাধারণ ভোক্তাদের মোটেও পছন্দ নয়। এই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঘরোয়া ও সাশ্রয়ী উপায়ে আমের আসল গুণাগুণ বজায় রাখার কৌশলগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
সঠিক উপায়ে আম সংরক্ষণ করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হলো বাজার বা বাগান থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সঠিক ফলটি বেছে নেওয়া। আম কেনার সময় বা গাছ থেকে পাড়ার সময় অত্যন্ত নরম, অতিরিক্ত পেকে যাওয়া কিংবা সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত বা দাগযুক্ত ফলগুলোকে শুরুতেই সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। ঘরোয়া উপায়ে দীর্ঘ মেয়াদে সতেজ রাখার জন্য কিছুটা শক্ত এবং সতেজ প্রকৃতির আম নির্বাচন করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো একটি আমে যদি সামান্য কালো দাগ বা পচনের প্রাথমিক লক্ষণ দৃশ্যমান থাকে তবে তা খুব দ্রুত তার চারপাশে থাকা অন্যান্য ভালো আমকেও সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলতে পারে। এই কারণে ফল সংগ্রহের সময় প্রতিটি আমের বোঁটা এবং চামড়ার উপরিভাগ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।
আম ঘরে নিয়ে আসার পর সেগুলোকে সরাসরি ঘরের কোনো কোণে রেখে না দিয়ে অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা একটি পরিষ্কার বালতি বা বড় গামলায় রাখা ঠান্ডা পানিতে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে রাখতে হবে। পানি ভেজানোর এই প্রাচীন পদ্ধতিটি আমের ভেতরের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত তাপ বা গরম বাতাসকে সম্পূর্ণ বের করে দিতে সাহায্য করে যার ফলে আমগুলো খুব দ্রুত পেকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়। পানি থেকে তোলার পর প্রতিটি আম একটি পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ শুকনো সুতি কাপড় দিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মুছে নিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সামান্যতম অসচেতনতা অবলম্বন করলে অর্থাৎ আমের গায়ে যদি সামান্য জলীয় বাষ্প বা পানি লেগে থাকে তবে সেখানে খুব দ্রুত কালো দাগ পড়ে ফাঙ্গাসের আক্রমণ ঘটতে পারে।
আমের সতেজতা এবং স্বাদ অটুট রাখার আরেকটি চমৎকার এবং অত্যন্ত সহজ প্রচলিত ঘরোয়া উপায় হলো প্রতিটি ফলকে আলাদাভাবে কাগজে মুড়িয়ে রাখা। ঘরে থাকা পুরনো খবরের কাগজ কিংবা বাজারের সাধারণ বাদামি রঙের পরিষ্কার কাগজ ব্যবহার করে প্রতিটি আমকে এককভাবে পেঁচিয়ে রাখা যেতে পারে। কাগজ আমের চারপাশের এবং গায়ের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও জলীয় কণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুষে নেয় যার ফলে ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া বা ফাঙ্গাস সহজে আমের উপরিভাগে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তবে আম যদি ইতিমধ্যে পুরোপুরি পেকে নরম হয়ে যায় তবে সেগুলোকে একটানা অনেক দিন কাগজের বদ্ধ আবরণে মুড়িয়ে রাখলে ভেতরের গরমে পচন ধরতে পারে। এই কারণে কাগজের ভেতরের আমের অবস্থা নিয়মিত বিরতিতে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সংরক্ষিত ফলগুলো রাখার জন্য ঘরের এমন একটি স্থান নির্বাচন করতে হবে যা সম্পূর্ণ খোলামেলা এবং যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা রয়েছে। আম কখনোই কোনো প্লাস্টিকের ব্যাগে, বদ্ধ ড্রামে বা সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে এমন কোনো উত্তপ্ত স্থানে রাখা একদম উচিত নয়। রান্নাঘরের চুলার চারপাশ বা যেখানে ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে এমন স্থান থেকে আম সবসময় নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখতে হবে। জায়গা বাঁচানোর উদ্দেশ্যে অনেকেই একটি আমের ওপর আরেকটি আম স্তূপ করে বা সাজিয়ে রাখার ভুলটি করে থাকেন যা আমের স্থায়িত্ব দ্রুত কমিয়ে দেয়। মাটির মেঝেতে বা ঘরের কোনো শীতল কোণে চট, সুতি কাপড় কিংবা খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর একটু ফাঁকা ফাঁকা করে এক স্তরে আম রাখলে প্রতিটি ফলের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস পৌঁছাতে পারে।
can বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শুকনো খড় এবং পাটের বস্তার ব্যবহার বহু বছর ধরে অত্যন্ত পরীক্ষিত ও সফল একটি মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। একটি বড় বাঁশের ঝুড়ি বা কাঠের ডালার নিচে শুকনো পরিষ্কার খড় বিছিয়ে তার ওপর আমগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে পুনরায় ওপর থেকে খড়ের হালকা আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। এই প্রাচীন গ্রামীণ প্রযুক্তিটি আমের চারপাশে একটি চমৎকার প্রাকৃতিক তাপমাত্রা বজায় রাখে যা ফলকে প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব হতে এবং সতেজ রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া বাংলার ঐতিহ্যবাহী বড় মাটির পাত্র বা কলসের ভেতরে খড় বিছিয়ে আম রাখলে মাটির পাত্রের শীতল গুণের কারণে আম দীর্ঘ দিন পর্যন্ত নষ্ট হয় না।
ঘরোয়া এই ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত আমগুলো প্রতিদিন অন্তত একবার অত্যন্ত মনোযোগের সাথে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করে দেখা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ। নিয়মিত পরীক্ষার সময় যদি কোনো আমে সামান্যতম কালো দাগ বা অতিরিক্ত নরম হয়ে যাওয়ার লক্ষণ চোখে পড়ে তবে সেটিকে অনতিবিলম্বে মূল স্তূপ থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখা গেছে যে একটি পচা বা আধা-পচা আম থেকে নিঃসৃত গ্যাস ও ফাঙ্গাস খুব সহজেই তার স্পর্শে থাকা অন্য সুস্থ ফলগুলোকে দ্রুত নষ্ট করে ফেলে। আম একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং জনপ্রিয় মৌসুমি ফল হওয়ায় এটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের আর্থিক সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে অপচয় রোধ করা সম্ভব।
যা কম স্পষ্ট তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহের সময়ে এই ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো শতভাগ কার্যকর থাকবে কি না কারণ অতিরিক্ত বৈশ্বিক তাপমাত্রা মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক সমস্ত গাণিতিক হিসাবকে উল্টে দেয়। তাসত্ত্বেও ফ্রিজের কৃত্রিম রাসায়নিক ঠান্ডা এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের ঝামেলা এড়াতে এই সহজ ও সাশ্রয়ী নিয়মগুলো মেনে চলা গ্রামীণ ও শহরের সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এই ছোট ছোট সচেতনতামূলক পদক্ষেপগুলো অনুসরণের মাধ্যমে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে আমের আসল প্রাকৃতিক স্বাদ ও মনকাড়া সুবাস সম্পূর্ণ উপভোগ করা সম্ভব। উম্মাহ কণ্ঠের লাইফস্টাইল ডেস্ক সবসময় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত করার লক্ষ্যে এই ধরণের বাস্তবসম্মত পরামর্শমূলক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে।
