বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

অসম সম্পর্ক ও আধুনিক সমাজ: ভুল জেনেও মানুষ কেন জড়ায়?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১১, ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

অসম সম্পর্ক ও আধুনিক সমাজ: ভুল জেনেও মানুষ কেন জড়ায়?

মানুষের আবেগ এবং যৌক্তিক চিন্তার মধ্যে অনেক সময় গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। প্রথাগত সমাজ কাঠামো এবং ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলো যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন তাতে প্রায়ই অশান্তি ও মানসিক বিপর্যয়ের ছায়া পড়ে। আধুনিক জীবনে একাকীত্ব দূর করা, নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা কিংবা অতৃপ্ত শখ পূরণের তাগিদে মানুষ অনেক সময় এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার পরিণতির কথা তারা আগে থেকেই কিছুটা আঁচ করতে পারেন। এই ধরনের সম্পর্কগুলো কেন গড়ে ওঠে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবনার অন্ত নেই।

মূলত জীবনের অপ্রাপ্তি মেটানোর নেশা এবং দ্রুত স্থিতিশীলতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে প্রথাগত রীতির বাইরে নিয়ে যায়। অনেকে বয়সের বড় ব্যবধান কিংবা ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বেছে নেন এই আশায় যে সেখানে হয়তো কোনো অভাব পূরণ হবে। তবে এই ধরনের সম্পর্কগুলো অনেক ক্ষেত্রে কেবল আবেগনির্ভর হয়, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধার চেয়ে প্রাপ্তিযোগটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিলাসিতার হাতছানিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। সমাজ এসব সম্পর্ককে বাঁকা চোখে দেখে, কারণ এতে পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে।

ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে সম্পর্কের প্রতিটি স্তর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারিত। ইসলাম বিবাহের পবিত্রতাকে রক্ষা করার জন্য কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছে এবং বিবাহবহির্ভূত যেকোনো সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা ব্যভিচারের ধারেকাছেও যেও না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)। এছাড়া সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মানুষের প্রতিটি কাজের ভিত্তি হলো তার নিয়ত বা উদ্দেশ্য (সহীহ আল-বুখারী, ২৭০৩)। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য যদি সৎ না হয় এবং তা নৈতিক সীমার বাইরে হয়, তবে তা কেবল অশান্তিই বয়ে আনে।

অসম সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমাজ ও পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন ভিন্ন ধর্মের কিংবা সামাজিক স্তরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তখন আইনি ও পারিবারিক জটিলতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এই চাপ সামলানোর জন্য অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই সম্পর্কের কারণে যখন সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তখন অপরাধবোধ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

কেউ যদি এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে থাকেন যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা। আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। যদি সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতেই হয়, তবে পরিবারের সঙ্গে ধৈর্য ধরে আলোচনা করা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক সীমার ভেতরে আসার চেষ্টা করা উচিত। নিজের নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে আপস করে কোনো সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সমাজের মূলধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের ওপর। আবেগ বা নেশার চেয়ে নিজের জীবনের সামগ্রিক শান্তি ও ধর্মীয় নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

banner
Link copied!