রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

জরায়ুমুখ ক্যান্সার রুখতে ভ্যাকসিন ও স্ক্রিনিং

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩, ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

জরায়ুমুখ ক্যান্সার রুখতে ভ্যাকসিন ও স্ক্রিনিং

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ব্রিসবেন থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত টুওম্বা শহর। সেখানেই নিজের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্রিসি ওয়াল্টার্স। বছরের পর বছর চেষ্টা করার পর মা হওয়ার আনন্দ যখন তার জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছিল, ঠিক তার ছয় মাস পরেই আকাশ ভেঙে পড়ল তার মাথায়। ক্রিসিকে জানানো হলো, তার মেয়ে হয়তো তার মা ছাড়াই বড় হবে। শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং বারবার চিকিৎসকের পরামর্শ ও বায়োপসির পর ৩৯ বছর বয়সী ক্রিসির শরীরে ধরা পড়ে অ্যাডভান্সড বা জটিল পর্যায়ের জরায়ুমুখ ক্যান্সার।

ক্রিসি আজ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত কষ্টকর এবং আক্রমণাত্মক সব চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার ক্যান্সার এখন শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার এই রোগ এখন টার্মিনাল বা চিকিৎসার অতীত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিজের ১২ বছর বয়সী মেয়ের সামনে মৃত্যু নিয়ে কথা বলা যে কতটা যন্ত্রণার, তা ক্রিসি প্রতিদিন উপলব্ধি করেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে তার সেই ১২ বছর বয়সী মেয়েটি যখন সরকারি কর্মসূচির আওতায় ক্যান্সার প্রতিরোধের টিকা নিল, তখন ক্রিসির চোখে ছিল অন্য এক আশার আলো।

অস্ট্রেলিয়া এখন বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জরায়ুমুখ ক্যান্সারকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। আগামী এক দশকের মধ্যে দেশটি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশটির বিজ্ঞানীদের কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রম এবং একটি সুসংগঠিত দ্বি-মুখী পদ্ধতি। টুওম্বার মতো ছোট শহর থেকে শুরু করে সিডনির বড় বড় ল্যাবরেটরি পর্যন্ত এই লড়াই এখন তুঙ্গে।

অস্ট্রেলিয়ার হাই স্কুলগুলোতে একটি দৃশ্য খুব সাধারণ। সেখানে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের লাইনে দাঁড়িয়ে টিকার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় এই শিশুদের হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি-র টিকা দেওয়া হয়। এই এইচপিভি ভাইরাসই জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মূল কারণ। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের কোনো উপসর্গ থাকে না এবং অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়াই এটি সেরে যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু শক্তিশালী স্ট্রেইন পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নেয়। জরায়ুমুখ ক্যান্সার হলো বিশ্বের নারীদের মধ্যে চতুর্থ সাধারণ ক্যান্সার, কিন্তু এটিই একমাত্র ক্যান্সার যা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ২০০৬ সালে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাগারে। প্রফেসর ইয়ান ফ্রেজার এবং ড. জিয়ান ঝো কয়েক দশকের গবেষণার পর ‍‍`গারডাসিল‍‍` নামক একটি নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন। এই টিকাটি এইচপিভি ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম বলে প্রমাণিত হয়। এর ঠিক এক বছর পর ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কারেন ক্যানফেল জানান, এই পাবলিক হেলথ উদ্ভাবনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে কাজ করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই পরিকল্পনার দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো টিকাদান এবং স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা। ২০১৩ সালে টিকাদান কর্মসূচীকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এতে ছেলেদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণ ছেলেরাও এই ভাইরাসের বাহক হতে পারে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রচলিত ‍‍`প্যাপ স্মিয়ার‍‍` টেস্ট থেকে আরও উন্নত এবং সংবেদনশীল ‍‍`এইচপিভি ভিত্তিক‍‍` স্ক্রিনিং ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়। এই পরীক্ষায় প্রতি পাঁচ বছর পর পর একবার পরীক্ষা করলেই ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও এখন অস্ট্রেলিয়ার এই মডেলকে অনুসরণ করে বিশ্বজুড়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাদের ‍‍`৯০-৭০-৯০‍‍` লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ মেয়েকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে টিকা দিতে হবে, ৭০ শতাংশ নারীকে ৩৫ এবং ৪৫ বছর বয়সে স্ক্রিনিং করতে হবে এবং ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত নারীকে সঠিক চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। অস্ট্রেলিয়া এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

ক্রিসি ওয়াল্টার্সের মতো যারা আজ মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের জীবন হয়তো এই সাফল্যে সরাসরি পরিবর্তন হবে না, কিন্তু তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অস্ট্রেলিয়া এক নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করছে। ক্রিসি যখন দেখেন তার মেয়ে আজ ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সুরক্ষিত, তখন তিনি এক ধরণের মানসিক শান্তি পান। তিনি চান না পৃথিবীর আর কোনো মা বা মেয়েকে এই ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হোক। বিজ্ঞানের এই জয় শুধু একটি দেশের নয়, বরং পুরো মানবজাতির জন্য এক নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে।

তবে এই যাত্রাপথ সবসময় মসৃণ ছিল না। শুরুতে টিকা নিয়ে নানা ধরণের সংশয় ও সামাজিক জড়তা ছিল। কিন্তু সরকারের স্বচ্ছ প্রচারণা এবং বিজ্ঞানীদের নিরলস তথ্য সরবরাহ সেই জড়তা কাটাতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকের মাধ্যমে এই সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এখন শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করার চেষ্টা চলছে।

প্রফেসর ক্যানফেল মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার এই সাফল্য প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বিজ্ঞানের সঠিক সমন্বয় থাকলে যেকোনো মরণব্যাধিকে পরাজিত করা সম্ভব। যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নারী এই ক্যান্সারে মারা যান, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার এই অগ্রযাত্রা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ক্রিসি ওয়াল্টার্সের মেয়ে যখন হাই স্কুলে টিকার প্লাস্টার হাতে ক্লাসে ফিরে যায়, তখন সে আসলে একটি ক্যান্সার মুক্ত ভবিষ্যতের দিকেই পা বাড়ায়। এই লড়াই এখন শুধু ল্যাবরেটরির ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন প্রতিটি পরিবারের সুরক্ষার কবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

banner
Link copied!