সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এখন চোখে পড়ে একের পর এক রোমহর্ষক ধর্ষণের খবর। সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা বা শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো আমাদের বারবার ভাবিয়ে তুলছে। সমাজ যখন সভ্যতার দাবি করে, তখন এই ধরনের বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তার ভিতকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। অপরাধীরা অবলীলায় নৃশংসতার কথা স্বীকার করছে, যা প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে বিবেকের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। কেন আমাদের সমাজ এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো কী, তা আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনার দাবি রাখে।
অনেকেই মনে করেন ধর্ষণ কেবল জৈবিক তাড়নার ফল। কিন্তু চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা একে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বিকৃত রূপ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রেইনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী শিফাত জাহান জানান, অপরাধীদের মধ্যে তীব্র নারীবিদ্বেষী মনোভাব, সহানুভূতির অভাব এবং সম্মতির ধারণার প্রতি অশ্রদ্ধা কাজ করে। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক অপরাধীই শৈশবে সহিংসতার শিকার হয়েছে বা অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তবে শৈশবের ট্রমা কখনোই অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। একই ধরনের প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ অনেক সময় অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠেন।

সমাজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই ভিকটিমের পোশাক বা বাইরে যাওয়ার সময়কে কাঠগড়ায় তোলা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন শিশির এই মানসিকতাকে সাইকোলজির ভাষায় ‘জাস্ট ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। সমাজ অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে চায় যে ভালো মানুষের সাথে ভালোই ঘটে। তাই অপরাধীকে না খুঁজে ভিকটিমের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সমাজ নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। এই ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা সামাজিক দোষারোপ একজন ভুক্তভোগীর জন্য শারীরিক আঘাতের চেয়েও মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়, যাকে ক্লিনিক্যাল ভাষায় ‘সেকেন্ডারি ট্রমা’ বলা হয়।
বর্তমানে হাতের মুঠোয় থাকা পর্নোগ্রাফি বা বিকৃত যৌন কনটেন্ট নারীদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। শিফাত জাহান জানান, যারা আগে থেকেই নারীবিদ্বেষী মনোভাব লালন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। মানুষ বারবার কোনো আগ্রাসী আচরণ পর্দায় দেখতে থাকলে অবচেতনভাবেই নারীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে না দেখে বস্তু হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা সামগ্রিক নৈতিকতাকে বিষিয়ে তুলছে।
এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন: প্রথমত, পারিবারিক শিক্ষা। পরিবারই হলো জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রথম পাঠশালা। ছেলেশিশুদের ছোটবেলা থেকেই ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতির ধারণা বোঝানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সঠিক যৌন শিক্ষা। শিক্ষা ব্যবস্থায় বয়ঃসন্ধিকালে বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা চালু করা জরুরি, যা শরীর সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেবে এবং অন্যের সীমানাকে সম্মান করতে শেখাবে। তৃতীয়ত, সহমর্মী সমাজ গঠন। কোনো ঘটনা ঘটার পর ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করে তার ট্রমা বাড়ানো বন্ধ করতে হবে। ভুক্তভোগীকে করুণা নয়, বরং আইনি ও মানসিক লড়াইয়ে সাহস দেওয়া পরিবারের প্রধান দায়িত্ব। ধর্ষণ কোনো একক সমস্যা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যাধি। আমরা যদি আজ চুপ থাকি বা ভিকটিমকে দোষ দিই, তবে কাল আমাদের কাছের কেউই এই সহিংসতার শিকার হতে পারে। তাই এখনই সময় দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর।
