আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের পূর্বাঞ্চলীয় মোহাম্মাদিয়া এলাকার একটি সরকারি শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ভোরে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ অন্তত ১১ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির সিভিল প্রোটেকশন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, রয়টার্স ও আল জাজিরা জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকারী সংস্থাটি জানিয়েছে যে স্থানীয় সময় ভোর আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটে চাইল্ডহুড রিলিফ ইনস্টিটিউশনের ভেতরে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এই রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি মূলত এতিম, পরিত্যক্ত নাবালক এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি আবাসিক যত্ন কেন্দ্র এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, যেখানে তাদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
সিভিল প্রোটেকশনের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ জনকে বিভিন্ন মাত্রার অগ্নিদগ্ধ অবস্থার জন্য এবং ২ জনকে ধোঁয়ার কারণে তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্য জরুরি চিকিৎসা প্রদান করেছে। এর পাশাপাশি তীব্র মানসিক আঘাত বা শকের শিকার হওয়া আরও ৭ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং পাঁচজন বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে যে গভীর রাতে উদ্ধার তৎপরতা দেখার জন্য ভবনের বাইরে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা ভিড় জমিয়েছেন। সরকারিভাবে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে যে উদ্ধারকর্মীরা ভবনের করিডোরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তিব্বুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক শোকবার্তায় এই ঘটনায় গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং শিশুদের মৃত্যু ও অন্যদের আহত হওয়ার খবরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ফরাসি সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশটির প্রধানমন্ত্রী সিফি গরিব আলজিয়ার্সের মুস্তফা পাশা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান এবং তাদের চিকিৎসা তদারকি করেন। হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান রশীদ বেলহাজ স্থানীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছেন যে কিছু মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হবে। স্থানীয় গণমাধ্যম আলজেরি প্যাট্রিওটিক জানিয়েছে যে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার ফাইটিং এবং অনুসন্ধান অভিযান ইতিমধ্যে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত সূত্রপাত ঠিক কীভাবে হয়েছিল এবং ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরণের গাফিলতি ছিল কি না। নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই এই আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে গত কয়েকদিন ধরে পুরো আলজেরিয়া জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে, যা দেশের উত্তরাঞ্চলে শত শত দাবানলের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএস জানিয়েছে যে গত ৮ জুলাই থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সিভিল প্রোটেকশন ইউনিট দেশব্যাপী ৯৩২টি আগুন নিভিয়েছে, যা এই অঞ্চলের পরিবেশগত সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আলজেরিয়ার সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে অরক্ষিত এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের সুরক্ষায় এই ধরণের ভবনে আধুনিক অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরণের দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের মনোবলকে আরও দুর্বল করে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের ট্র্যাজেডি এড়াতে দেশের সব আশ্রয় কেন্দ্রে নতুন নিরাপত্তা গাইডলাইন জারি করা হবে।
ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে এতিম ও অসহায় শিশুদের দেখাশোনা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এতিমদের প্রতি সদয় হওয়ার এবং তাদের অধিকার রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২২০)। এই দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা বিশেষ দোয়ার আয়োজন করেছেন। সরকার ঘোষণা করেছে যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে এবং আশ্রয়হীন শিশুদের জন্য বিকল্প নিরাপদ আবাসের ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
