বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩

সুদান গৃহযুদ্ধে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও জনমিতি সংকটের মুখে দেশ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম

সুদান গৃহযুদ্ধে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও জনমিতি সংকটের মুখে দেশ

সুদান গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির সামগ্রিক জনমিতি কাঠামো মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে রাজধানী খার্তুমে বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রী মুতাসিম আহমেদ সালেহ নিশ্চিত করেছেন, আল জাজিরা জানিয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ-এর মধ্যে এই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এই বিধ্বংসী যুদ্ধ দেশটির জনসংখ্যা বণ্টন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

মন্ত্রী মুতাসিম আহমেদ সালেহ আল জাজিরা অ্যারাবিককে বলেন যে তাঁর মন্ত্রণালয় বর্তমানে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে মিলে একটি নতুন জনসংখ্যা নীতি জোরদার করার জন্য কাজ করছে, যা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকবে। যুদ্ধের আগে আফ্রিকার এই দেশটির জনসংখ্যা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬ কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে সরকারি পূর্বাভাসে আশা করা হয়েছিল। ২০২০ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ এবং এর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২.৩৯ শতাংশ, যা বিশ্বব্যাপী অন্যতম সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার হিসেবে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দক্ষিণ দারফুর, উত্তর দারফুর এবং মধ্য দারফুর রাজ্যের লাখ লাখ মানুষকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করেছে এবং হাজার হাজার মানুষকে মিশর, দক্ষিণ সুদান ও চাদের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই তীব্র মানবিক সংকটের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া সুদানের সরকার কীভাবে তাদের এই নতুন জনসংখ্যা নীতি এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করবে। মন্ত্রী সালেহ উল্লেখ করেন যে এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় জনমিতি পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্যের মাত্রা ব্যাপক বৃদ্ধি যাওয়া, বিপুল সংখ্যক নাগরিকের আয়ের উৎস হারিয়ে যাওয়া এবং মৌলিক সেবা খাতের চরম অবনতি। এর পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজার এবং মানব পুঁজি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা কাটিয়ে ওঠা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে তাঁর সরকার দেশের নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করে যাবে কারণ মানবসম্পদই হলো জাতীয় পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

সুদানের এই গভীর জনমিতি সংকটের নেপথ্যে দেশটির একটি অনন্য জনসংখ্যাগত কাঠামো জড়িত রয়েছে কারণ এই দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। ২০০৮ সালের সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল যুবসমাজ সুদানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বড় চালিকাশক্তি হতে পারত। কিন্তু যুদ্ধের আগেই তরুণ সমাজ সীমিত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ব্যাপক দারিদ্র্যের মুখোমুখি ছিল, যা চলমান সংঘাতের ফলে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সুদানিজ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনের পরিচালক খালিদ সাদ আল জাজিরাকে জানান যে সুদানের এই জনসংখ্যা সংকট কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয়নি, বরং কয়েক দশক ধরে এখানে জনসংখ্যা বণ্টনে এক ধরণের স্পষ্ট ভারসাম্যহীনতা ছিল।

পবিত্র কুরআনে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি ও বিপর্যয়ের সময় মুমিনদের ধৈর্য ধারণ করার এবং ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট মোকাবেলালার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)। খালিদ সাদ বলেন যে সেনাবাহিনী যেসব এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে সেখানে মানুষ ফিরে আসতে শুরু করলেও জনমিতি সংকট এখনই শেষ হচ্ছে না, কারণ ফিরে আসা মানুষগুলো এমন এক ধ্বংসস্তূপে প্রবেশ করছে যেখানে কোনো অর্থনৈতিক অবকাঠামো অবশিষ্ট নেই। তাই বাস্তুচ্যুত মানুষদের টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতি রোধ করাই এখন সুদানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

banner
Link copied!