ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ আদালত বৃহস্পতিবার লুক্সেমবার্গে এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেছে যে কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িতদের জন্য স্পেনে সাধারণ ক্ষমা আইন কার্যকর করা ইইউ আইনের পরিপন্থী নয়, রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। এই রায়ের ফলে স্পেনের বর্তমান সমাজতান্ত্রিক সরকার এবং তাদের কাতালান মিত্রদের রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে আরও শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন ইউরোপীয় বিশ্লেষকেরা। ইউরোপীয় আদালতের বিচারকেরা তাদের আনুষ্ঠানিক রায়ে উল্লেখ করেছেন যে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করা এবং দীর্ঘদিনের বিভেদ ভুলে পারস্পরিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি ফৌজদারি দায়মুক্তি ঘোষণা করে, তবে ইইউ আইন তার বিরোধিতা করে না। কারণ এই ধরণের বিশেষ আইন প্রণয়ন এবং তা নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রয়োগ করার সম্পূর্ণ এখতিয়ার ও সার্বভৌমত্ব সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার অধীনে পড়ে।
২০২৪ সালে স্পেনের নিম্নকক্ষে এই বিতর্কিত আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়েছিল যা ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত শত শত সরকারি কর্মকর্তা ও তৃণমূল রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে থাকা সব ধরণের ফৌজদারি মামলা ও রেকর্ড বাতিলের পথ সুগম করে। স্পেনে সাধারণ ক্ষমা আইন পাসের এই বিচারিক বৈধতা কাতালোনিয়ার নির্বাসিত স্বাধীনতাকামী প্রধান নেতা কার্লস পুজদেমন্তের দীর্ঘদিনের নির্বাসন ভেঙে স্বদেশে মর্যাদার সাথে ফেরার পথ পরিষ্কার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক আইনটি কার্যকর করার মাধ্যমে স্পেনের বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটার একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা পন্থী নেতারা ২০১৭ সালে একটি ঐতিহাসিক গণভোটের আয়োজন করেছিলেন।
স্পেনের সাংবিধানিক আদালত সেই গণভোটকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পরও স্বাধীনতাকামীরা তা সম্পন্ন করায় তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ নানা গুরুতর অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং অনেককে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মূলত ২০২৩ সালের অনির্ধারিত ও ত্রিশঙ্কু সাধারণ নির্বাচনের পর নিজের ভঙ্গুর প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখতে কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর সমর্থন চেয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে এবং ক্ষমতা ধরে রাখার শর্ত হিসেবেই তিনি এই সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেন, যা দেশের ডানপন্থী ও রক্ষণশীল দলগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। ইসলামে শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা যেকোনো সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১০)।
বৈস্মিক রাজনীতির এই প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই আইনি প্রয়াসকে ইউরোপীয় আদালত বৈধতা দিলেও স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব এখনো অত্যন্ত গভীর ও স্পর্শকাতর। যা কম স্পষ্ট তা হলো স্পেনের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগ এই আন্তর্জাতিক রায়ের পর নির্বাসিত নেতাদের বিরুদ্ধে থাকা স্থানীয় গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো ঠিক কত দ্রুত প্রত্যাহার করে নেবে। আদালতের নিয়ম অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে সাধারণ ক্ষমার আবেদন নিষ্পত্তি করার একটি নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিচারকেরা স্পষ্ট করেছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইউরোপীয় আদালতের প্রাথমিক রেফারেন্স প্রক্রিয়ার রায়গুলোর জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। রক্ষণশীল দলগুলো ইতিমধ্যেই এই রায়ের বিরুদ্ধে মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে দেশব্যাপী নতুন করে রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে যা স্পেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব বিচারিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা।
