ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। দেশটির দীর্ঘ এক দশকের সংঘাতে এই নতুন সামরিক কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি হুথিরা সরকারি সামরিক শিবির ও জনসমাগম লক্ষ্য করে ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন সেনাকে হতাহত করেছে। এর জবাবে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত সরকারি বাহিনীও দূর নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করে সামনের সারিতে থাকা হুথি যোদ্ধাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। সংঘাতের এই নতুন পর্বে উভয় পক্ষের কৌশলগত সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সরকারি সামরিক বাহিনী সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখিয়েছে যে ড্রোনগুলোর মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে নিখুঁত বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে। এর ফলে বেশ কিছু সশস্ত্র যোদ্ধা, বর্মযুক্ত যান এবং গোপন আস্তানা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। বন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট স্টাডিজের গবেষক মারিয়াস বালিচ জানিয়েছেন যে সরকারি বাহিনী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা অর্জন করছে। তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সম্মুখ সমরে এই ধরনের পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ও দূর নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। যদিও হুথি বিদ্রোহীদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আঘাত হানার সুবিশাল পরিধির সঙ্গে সরকারি বাহিনী পুরোপুরি সমকক্ষ হতে পারেনি, তবুও এই অগ্রগতি যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক রিউবেন দাস উল্লেখ করেছেন যে সরকারি বাহিনী রোটরি উইং ড্রোন থেকে বিস্ফোরক নিক্ষেপের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চৌদ্দশো চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোতে গভীর বিভাজন তৈরি হয়। তখন থেকেই হুথিরা অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। দীর্ঘ প্রায় দশ বছরের সংঘাতে তারা বিস্তৃত পরিসরের ড্রোন এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। কাসেফ ও সাম্মাদ পরিবারের দূরপাল্লার ড্রোনগুলোর পাশাপাশি তারা বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তির সংযোজন ঘটিয়েছে। ইয়েমেনের মারিব, আল জউফ, তাইজ, হাজ্জাহ ও আল ধালেয়ার বিভিন্ন সম্মুখ সমরে বর্তমানে উভয় পক্ষই ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কৌশলগত অভিজ্ঞতা থেকেও হুথিরা নানা নতুন উদ্ভাবন গ্রহণ করছে বলে গবেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।
হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে কাসেফ পরিবারের তিন কেজি ওয়ারহেডবাহী ড্রোন এবং পনেরোশো কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লার সাম্মাদ তিন ড্রোন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উন্নত প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষের ওপর কৌশলগত চতুরতা প্রদর্শন করে আসছে। তবে সরকারি বাহিনীও বসে নেই; তারা স্থানীয় প্রযুক্তির সহায়তায় ড্রোনগুলোকে আধুনিকায়ন করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যুদ্ধক্ষেত্রের এই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রথমবারের মতো তাদের সামরিক সরঞ্জামের অংশ হিসেবে নিজস্ব ড্রোন প্রদর্শনীতে উন্মুক্ত করেছে। সরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত তথ্যে দেখা গেছে যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা বেশ কয়েকটি ড্রোন পর্যবেক্ষণ করেছেন। স্থানীয় গবেষকদের মতে, বেসামরিক উদ্দেশ্যে তৈরি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ড্রোনকে সামরিক অভিযানে ব্যবহার উপযোগী করে রূপান্তর করা হয়েছে। এই ড্রোনগুলো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিতকরণ এবং নির্দিষ্ট স্থানে বোমা নিক্ষেপের কাজে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এই গৃহযুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তির লড়াই দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন ইয়েমেনের মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের ওপর নিবদ্ধ রয়েছে। শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো কতটা সফল হবে, তা আগামী দিনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
