বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা তেহরানের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা তেহরানের

গত বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকার যে দাবি করা হয়েছিল, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির আংশিক সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে আল জাজিরা এবং রয়টার্স জানিয়েছে যে ইরানের আধাসামরিক বাসিজ ফোর্সের কমান্ডার হুসেইন তাইয়েব স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটটি সম্পূর্ণভাবে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই দ্বান্দ্বিক দাবি বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের বাজারে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে দাবি করেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তারা এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েনকে এক দুর্ভেদের প্রাচীরের সাথে তুলনা করে বলেছিলেন যে এই বিষয়ে ইরানের করার কিছু নেই। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে যে এই প্রণালীর স্বাভাবিক চলাচল বা নিয়ন্ত্রণ মার্কিন বাহিনীর হাতে যাওয়ার দাবি বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

ইরানি সামরিক কমান্ডার হুসেইন তাইয়েব তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেছেন যে মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ইরানের জনপ্রিয়তা ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু তারা আবারও ব্যর্থ হয়েছে। তেহরানের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে পারস্য উপসাগরের এই সংবেদনশীল জলপথে যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেল ট্যাংকারের চলাচল কঠোর নিরাপত্তা নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্বানুমতি ছাড়া নিরাপদ অতিক্রমের কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি ঘিরে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের একটি বিরাট অংশ এই হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মূল জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে একের পর এক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে নৌবাহিনীর টহলের মাধ্যমে বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তেহরান বলছে যে তাদের অনুমতি ছাড়া এই জলপথে কোনো জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা মনে করছেন যে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিকল্প রুট খোঁজার চেষ্টা করলেও হরমুজ প্রণালীর বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। ওমানের উপকূলীয় তেল দূষণ এবং হরমুজের এই উত্তেজনা একসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুশিয়ারি দেওয়া হলেও ইরান তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চ থেকে উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানানো হলেও মাঠের বাস্তবতায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই বাগযুদ্ধ কেবল কথার লড়াই নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়েরই একটি অংশ। দুই পক্ষের এই কঠোর অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। কী ধরনের সমঝোতা বা আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আসবে তা নিয়ে বিশ্বনেতারা এখনো নানা জল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে মাঠপর্যায়ে সামরিক প্রস্তুতি ও উত্তেজনা কমছে না।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ভূরাজনৈতিক সংঘাতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল দীর্ঘমেয়াদে কতটা নিরাপদ থাকবে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান আসবে কি না। ইরানের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের শর্তগুলো পূরণ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই জলপথের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে। আন্তর্জাতিক অংশীজন ও কূটনৈতিক মহল এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ হরমুজ প্রণালীর এই সংকট যেকোনো মুহূর্তে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।

banner
Link copied!