বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ওমানের উপকূলে ছড়িয়ে পড়ল বিশাল তেল ট্যাংকার দুর্ঘটনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

ওমানের উপকূলে ছড়িয়ে পড়ল বিশাল তেল ট্যাংকার দুর্ঘটনা

ওমানের উপকূলীয় এলাকায় একটি ক্ষতিগ্রস্ত তেল ট্যাংকার থেকে ছড়িয়ে পড়া বিশাল তেল দূষণ বা সলিক সম্প্রতি দেশটির সমুদ্র সৈকতে এসে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। আল জাজিরা এবং রয়টার্স জানিয়েছে যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়া এই তেল দূষণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সামুদ্রিক পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল স্থানীয় উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সমগ্র অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গত সোমবার ওমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা এই বিপুল পরিমাণ তেল নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তখন প্রায় তিনশো নব্বই বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছিল বলে দেশটির পরিবেশগত পরিসংখ্যানে উঠে এসেছিল। স্যাটেলাইট চিত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে তেল দূষণ বিশেষজ্ঞ জন আমস জানিয়েছেন যে বর্তমানে এই ক্ষতিকারক সলিকটির পরিধি দুই হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে এর ফলে রাস মাদরাকা এলাকার প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চল এবং মাসিরাহ দ্বীপের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে।

গত আট জুন ক্রুদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য বিস্ফোরণের খবর জানানোর পর থেকেই ক্যারোলিন বেজেনগি নামক এই তেল ট্যাংকারটি ওমানের শারবিথাত উপকূল থেকে প্রায় বাইশ নটিক্যাল মাইল দূরে আটকা পড়ে লিক হতে শুরু করে। রাশিয়া থেকে ভারতের দিকে যাত্রাপথকালে সংঘটিত এই দুর্ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। রয়টার্স জানিয়েছে যে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই ট্যাংকারটিতে আনুমানিক আট লক্ষ ব্যারেল তেল বোঝাই করা ছিল যা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে পরিবাহিত হচ্ছিল। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির অনুসন্ধানে জানা গেছে যে জাহাজটি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমানের আল কুবলিয়্যাহ দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায়漂রছিল।

ওমান নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে বর্তমান পর্যবেক্ষণের ফলাফল অনুযায়ী রাস মাদরাকা অঞ্চলের বেশ কিছু সমুদ্র সৈকত ইতোমধ্যে তেল দূষণের কবলে পড়েছে। আরব সাগরের এই উপকূলীয় অঞ্চলের আশপাশে অবস্থিত সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকাগুলোতে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী বসবাস করে। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস গত সপ্তাহে সতর্ক করেছিল যে এই বিশাল তেল বিপর্যয় সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সামুদ্রিক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডেলিয়া জানিয়েছেন যে এই ধরনের অবৈধ ট্যাংকারগুলো আন্তর্জাতিক দূষণ প্রতিরোধ নীতি অনুসরণ করে না বলে প্রতিকারের কাজ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।

ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও তেল দূষণের ঘটনা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে যা আঞ্চলিক সমুদ্র নিরাপত্তার সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কী ধরনের সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বিশাল পরিবেশগত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। ওমানের স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো যৌথভাবে উপকূল পরিষ্কার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যথাসম্ভব কমিয়ে আনা যায়।

সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এড়াতে অনেক পুরনো এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের জাহাজগুলো এই অঞ্চলে চলাচল করছে। ক্যামেরুনের পতাকা বহনকারী এই ট্যাংকারটির দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেকোনো ছোট দুর্ঘটনা কত বড় আঞ্চলিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ওমানের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলেও তেল দূষণের আলামত পাওয়া যাওয়ায় পরিবেশবাদীরা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আগামী দিনগুলোতে এই ভয়াবহ পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

banner
Link copied!