বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

উগান্ডায় তীব্র খাদ্য সংকট ও অনাহারজনিত মৃত্যু

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

উগান্ডায় তীব্র খাদ্য সংকট ও অনাহারজনিত মৃত্যু

আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় বর্তমানে এক ভয়াবহ খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র খরার ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কারামোজা অঞ্চল এবং বিস্তৃত হর্ন অফ আফ্রিকা জুড়েই এই সংকট চরম রূপ ধারণ করেছে। আল জাজিরা এবং এএফপির প্রতিবেদনে প্রকাশ যে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং অনাহারের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেমিন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, কারামোজা অঞ্চলে ইতিমধ্যেই অনাহারে অন্তত উনিশ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রায় পনেরো লক্ষ মানুষ চরম পুষ্টিহীনতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিজমি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় উৎপাদনে চরম ধস নেমেছে। পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের হারিয়ে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দুই হাজার বাইশ সালের ভয়াবহ খাদ্য সংকটের স্মৃতি উসকে দিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি, যেখানে দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে উগান্ডা সরকার কারামোজা অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে যে মাত্রায় খরা ও অনাহার বিস্তার লাভ করেছে, তাতে সরকারি এই ত্রাণ তৎপরতা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এই গভীর সংকটের মূল কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতকে দায়ী করেছেন গবেষকরা। বছরের পর বছর ধরে চলা আবহাওয়ার চরম বৈরিতা উগান্ডার গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ মূলত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং গবাদি পশুগুলো খাদ্য ও পানির অভাবে মারা যাচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ জনপদের মানুষের আয়োজক উৎস সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তারা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে আসলেও সময়মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কারামোজা অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই কেবল উগান্ডার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলের জলবায়ু সংকটের একটি ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর কাজ শুরু হলেও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর কারণে অনেক এলাকায় সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সাময়িক খাদ্য বিতরণ করে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই কৃষি পরিকাঠামো তৈরি করা, খরা-সহনশীল ফসলের বীজ সরবরাহ করা এবং জলের সঠিক ব্যবহারের জন্য আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। উগান্ডার এই সংকট যদি দ্রুত সমাধান করা না হয়, তবে তা সমগ্র অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানোর জন্য উগান্ডা সরকার এবং আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীকে একত্রে কাজ করতে হবে। কারামোজা অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন কেবল ত্রাণের আশায় দিন গুনছে না, বরং তারা এমন একটি স্থায়ী সমাধান চাইছে যা তাদের আগামী প্রজন্মকে এই চরম অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে এই সংকটের পরিণতি কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

banner
Link copied!