বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

চীনের রোবট আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

চীনের রোবট আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক ধাক্কা দিয়ে নতুন মডেলের হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ এবং কোয়াড্রুপেড বা চার পায়ের রোবট আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিবিসি নিউজ এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশ যে এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য মূলত চীনা রোবট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, কারণ বর্তমান বৈশ্বিক হিউম্যানয়েড রোবট বাজারের প্রায় পঁচাশি শতাংশই চীনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন নতুন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বা এফসিসি সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে নেটওয়ার্কযুক্ত এসব উন্নত রোবটের মাধ্যমে সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো এবং মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। বিদেশি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা হ্যাকাররা দূর থেকে সাইবার হামলার মাধ্যমে সহজেই এসব রোবটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। মূলত এই ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই তাৎক্ষণিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা কেবল ভবিষ্যতে বাজারে আসতে চলা নতুন মডেলগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

পূর্বে অনুমোদিত বা ইতিমধ্যে বাজারে কেনা রোবটগুলো বিক্রি করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা রাখা হয়নি। রোবটের পাশাপাশি ডেটা সেন্টার ও সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলে ব্যবহৃত চীনা পাওয়ার ইনভার্টার আমদানির ওপরও সমানভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে যেকোনো ধরনের দূরবর্তী সাইবার আক্রমণ বা অচল করার চক্রান্ত থেকে রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এফসিসি। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন নীতি নির্ধারকরা।

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে চীনের শীর্ষস্থানীয় রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে। ইউনিট্রি, ইউবিটেক এবং এজিআইবটের মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো সাশ্রয়ী মূল্যের হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং গবেষকদের কাছে এসব যন্ত্রের চাহিদা আকাশচুম্বী ছিল। অথচ ওয়াশিংটনের এই কড়া সিদ্ধান্তের ফলে রাতারাতি সেই বাজার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি গবেষণায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর নীতিকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। ইলন মাস্কের টেসলা এবং ফিগার এআইয়ের মতো সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বৈশ্বিক বাজারে চীনা আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ পাবে। তবে ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বেইজিং। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই পদক্ষেপের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মার্কিন সরকার বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অজুহাতে সুরক্ষাবাদী নীতি চাপিয়ে দিচ্ছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক কঠোর হুঁশিয়ারিতে জানিয়েছে যে নিজেদের বৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেইজিং প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের এই শীতল যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি লংঘন করে চলা এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। প্রযুক্তির দুনিয়ায় এই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!