বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফিফার বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা ঘিরে তীব্র বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

ফিফার বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা ঘিরে তীব্র বিতর্ক

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আবারও বড় ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার অংশবিশেষ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির একটি নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। আল জাজিরা ও রয়টার্সের তথ্যমতে, এই প্রস্তাব সামনে আসার পর থেকেই ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অর্থাৎ উয়েফা এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এমনকি উয়েফার পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতা বয়কটের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।

চল্লিশ দল পেরিয়ে আটচল্লিশ দলের এবারের বিশ্বকাপ সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন পরিকল্পনা সামনে এল। স্পেনের হাতে ট্রফি ওঠার পর টুর্নামেন্টের নানামুখী সাফল্য উদযাপিত হলেও টিকিটের উচ্চমূল্য এবং সাধারণ দর্শকদের স্টেডিয়ামের বাইরে রাখার অভিযোগ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিতর্ক চলছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফার প্রধান প্রতিরক্ষা ছিল যে টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্ত আয় বিশ্বজুড়ে ফুটবলের তৃণমূল পরিকাঠামো এবং প্রশাসনের কাজে ব্যয় করা হয়। তবে নতুন এই উদ্যোগে সেই আয়ের পরিধি আরও বহুগুণ বাড়াতে বাণিজ্যিক অংশীদার বা প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিফা একটি সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের ঘোষণা দিয়েছে যার মাধ্যমে বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ। ফিফা দাবি করেছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের মূল ক্ষমতা, খেলার নিয়মকানুন এবং ম্যাচ সূচি প্রণয়নের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। তবে নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাইরে থেকে বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের কাছে লভ্যাংশ বা সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রি করে প্রায় চারশো কোটি ডলারের বেশি অর্থ তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যা মূলত খেলাধুলার বাণিজ্যিক প্রসারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছে ফিফা।

তবে এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম। ফিফার তথ্যমতে থ্রাইভ ইটার্নাল নামের এই প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছে। মজার বিষয় হলো এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা যোশোয়া কুশনার। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপতির পরিবারের একজন ঘনিষ্ট স্বজন। ফলে এই বাণিজ্যিক চুক্তির নেপথ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রয়টার্স ও আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে ক্রিকেটের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল এবং দ্য হান্ড্রেড টুর্নামেন্টের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলেই ফুটবলকে সাজাতে চাইছে ফিফা।

তবে ফুটবলের ঐতিহ্য এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মৌলিক জায়গায় আঘাত হেনেছে এই সিদ্ধান্ত। উয়েফা অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো ফুটবলের আত্মা এবং এর শাসনব্যবস্থা কোনো ব্যবসার পণ্য নয়। কোনো রকম স্বচ্ছতা ছাড়াই বহিরাগতদের হাতে ফুটবলের অংশবিশেষ তুলে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। উয়েফার মতে ফুটবলের কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই এবং ফিফার এটি বিক্রির কোনো অধিকার নেই। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে ফুটবল কোনো পণ্য নয় এবং এটি স্টেডিয়ামে গলা ফাটানো সাধারণ দর্শকদের অধিকার।

বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন বা কনকাকাফ জানিয়েছে যে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনা করা হয়নি। পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। খেলাধুলায় বাণিজ্যিকীকরণের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সাধারণ ভক্তদের মধ্যেও ক্ষোভের অন্ত নেই। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যদিও দাবি করেছেন যে এর মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত অর্থ ফুটবলের উন্নয়নেই পুনরায় বিনিয়োগ করা হবে, তবুও এই বিশাল শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ফুটবলের মূল কাঠামেকে কোন দিকে নিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়। কী ঘটবে তা সময়ই বলে দেবে।

banner
Link copied!