ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল প্রতীক্ষিত ও প্রশংসিত সিনেমা দ্য ওডিসি বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পেলেও এর অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা জোগানো এক শীর্ষস্থানীয় অনুবাদকের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি নিউজ জানিয়েছে যে ক্লাসিক এই মহাকাব্যের দুই হাজার সতেরো সালের জনপ্রিয় ইংরেজি অনুবাদের গবেষক ও অধ্যাপক এমিলি উইলসন লন্ডন রিভিউ অফ বুকস পত্রিকায় সিনেমাটি সম্পর্কে একটি অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন সমালোচনা প্রকাশ করেছেন। বিশ্বজুড়ে যেখানে চলচ্চিত্র সমালোচকেরা ছবিটির প্রশংসা করছেন, সেখানে অনুবাদের নেপথ্যের প্রধান ব্যক্তিত্বের এমন অনমনীয় অবস্থান চলচ্চিত্র জগতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
বিশিষ্ট এই গবেষক তার দীর্ঘ পর্যালোচনায় সিনেমার চিত্রনাট্য এবং আখ্যান কাঠামোর কঠোর সমালোচনা করে উল্লেখ করেছেন যে ছবির ভেতরের কাহিনী অত্যন্ত গতানুগতিক এবং এর নাট্যরূপ বেশ চমকপ্রদ ও কৃত্রিম মনে হয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এই ছবির সংলাপ অত্যন্ত মানহীন এবং কোনো চরিত্রের ভেতরের তাড়না বা উদ্দেশ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তদুপরি, সিনেমায় আবেগগত, মনস্তাত্ত্বিক কিংবা রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে তিনি তার নিবন্ধে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান এর আগে প্রেস ট্যুরে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে তিনি তার প্রধান চরিত্র ওডিসিয়াসের চরিত্রায়নের জন্য এমিলি উইলসনের অনুবাদের প্রথম লাইনের সাহায্য নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুবাদের মূল রচয়িতাই যখন সিনেমার দৃশ্যরূপ ও চরিত্রগুলোর রূপায়ণ নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তখন তা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে এক বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। উইলসন তার পর্যালোচনায় আরও যোগ করেছেন যে সাধারণ দর্শকরা পরিবারের সাথে বসে ছবি উপভোগ করার সময় এটিকে একটি সুন্দর চাক্ষুষ বিনোদন হিসেবে দেখতে পারেন, ঠিক যেন কোনো উৎসবের রাতের বর্ণিল আতশবাজি প্রদর্শনী।
ছবিটির কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি স্বীকার করেছেন যে এই মহাকাব্যটি বহু মানুষকে আবার নতুন করে সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনছে এবং তার নিজস্ব বইটির বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে এই চলচ্চিত্রের কারণে হয়তো কলেজ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সাহিত্য, ভাষা ও ইতিহাস বিভাগগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটবেন। নোলানের এই মহাকাব্যিক প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষকে নতুন করে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে এবং এর জন্য তিনি পরিচালককে ধন্যবাদ জানাতেও দ্বিধ করেননি।
তবে সিনেমাটির সার্বিক উপস্থাপনা এবং বড় বড় বিস্ফোরণ ও বিশাল আকৃতির দানবের দৃশ্যায়নের বাইরেও গভীরতার দিক থেকে ছবিটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে তিনি তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মূল কবিতার সাথে তুলনা করে তিনি উল্লেখ করেছেন যে কবিতায় নারী চরিত্রগুলোর যে জোরালো উপস্থিতি ও অভিব্যক্তি ছিল, সিনেমার স্ক্রিনে তার প্রতিফলন অত্যন্ত সীমিত। নোলানের বিগত চলচ্চিত্রগুলোর তুলনায় নারী চরিত্রগুলোর সংলাপ এবার কিছুটা বেশি হলেও তা সাহিত্যিক গভীরতার মানদণ্ডে অনেক নিচে অবস্থান করছে বলে তিনি মনে করেন।
চলচ্চিত্র শিল্পে এই ধরনের কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়, তবে মূল অনুপ্রেরণাদাতার কাছ থেকে এমন সরাসরি আঘাত পাওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। বক্স অফিসের বিপুল সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া নোলানের এই প্রজেক্টটিকে নিয়ে আলোচনার পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে এই সিনেমাটি কীভাবে প্রভাব ফেলে এবং দর্শকরা একে কীভাবে গ্রহণ করেন, তা দেখার জন্য চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
