ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর বোর্দোর কাছে ভয়াবহ দাবানল আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করায় ফ্রান্স ও স্পেনে তিন লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠায় দুই দেশের উদ্ধারকর্মীরা সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ড দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে দাবানলের শিখা বোর্দো শহরের সীমান্ত থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে, যা স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে, ফ্রান্সে এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ষাট হাজার মানুষকে বাড়িঘর ও পর্যটনকেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গিরোন্ডে ও ল্যান্ডেস অঞ্চলে গত কয়েক দিনে দাবানলের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কপারনিকাস স্যাটেলাইটের চিত্রে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ফ্রান্সের সমুদ্র উপকূলীয় ক্যাপ ফেরাট উপদ্বীপের হাজার হাজার অধিবাসী ও পর্যটককে নৌকায় করে সরিয়ে নেওয়া হয়, কারণ মূল সড়কগুলো আগুনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
স্পেনের অবস্থাও একই রকম জটিল হয়ে উঠেছে, যেখানে দাবানল দেশটির রাজধানী মাদ্রিদের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী মাদ্রিদ ও অ্যাভিলা প্রদেশের একাধিক স্থানে আগুন একত্রিত হয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশটিতে নব্বই হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। বাতাস তীব্র হওয়ায় অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর আধুনিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও ফায়ারফাইটাররা সরাসরি আগুনের মুখোমুখি হতে পারছেন না।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুমণ্ডলে চরম শুষ্কতা ও উত্তাপের কারণে আক্রান্ত এলাকায় বিশাল আকারের কনেক্টিভ আগুনের মেঘ তৈরি হয়েছে, যা আগুনের শিখাকে আরও দ্রুত সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, পরবর্তী কয়েক দিনে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা না কমলে এই আগুন ঠিক কত দিনে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। ফ্রান্সে এ পর্যন্ত আশিটির বেশি ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বহু কৃষি জমি আগুনে পুড়ে গেছে বলে সরকারি তথ্যে জানা গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে সিভিল প্রটেকশন মেকানিজম সক্রিয় করে ফ্রান্স ও স্পেনে যৌথভাবে অগ্নিনির্বাপক বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে। স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া উপকূলেও নতুন করে দাবানল শুরু হওয়ায় সেখানেও অন্তত পনেরো হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। পরিবেশ গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে খরার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার ফিরে আসছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারের নির্দেশ জারি করেছেন।
দুই দেশজুড়ে আশ্রয়হীন মানুষের জন্য স্পোর্টস হল এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রগুলোতে অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাজার হাজার পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা তাদের সম্পদ ফেলে এসব কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা চুয়াল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকে সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
