ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং অনিয়মের অভিযোগে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এক অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নরওয়ের বিখ্যাত ভাইকিং রো উদযাপনের অনুকরণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। কাকারোচ জ্যান্তি পার্টি নামের একটি স্থানীয় নাগরিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে শত শত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং অধিকারকর্মী মুম্বাইয়ের রাস্তায় নেমে আসেন। তারা ভাইকিং রো উদযাপনের প্রচলিত সুর বজায় রেখে শ্লোগানের মূল শব্দ পরিবর্তন করে শিক্ষা মন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগের জোর দাবি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নরওয়ের ভাইকিং রো মূলত একটি জনপ্রিয় বিজয় উদযাপনের রীতি, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা সারিবদ্ধভাবে বসে একসাথে নৌকা বাওয়ার অভিনয় করে উল্লাস প্রকাশ করে থাকেন। মুম্বাইয়ের বিক্ষোভকারীরা এই ছন্দময় শারীরিক কসরতকে রাজপথে ফুটিয়ে তোলেন, তবে উল্লাসের পরিবর্তে তারা পুরো আয়োজনটিকে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপান্তর করেন। আন্দোলনকারীরা সারিবদ্ধভাবে রাস্তায় বসে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নৌকা বাওয়ার ছন্দে দুলতে থাকেন এবং প্রতিটি ছন্দের সাথে উচ্চস্বরে পদত্যাগের শ্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি হলো, সাম্প্রতিক সময়ে পরপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং এর দায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রীর অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত।
ভারতে গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের সরকারি নিয়োগ এবং ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সারাদেশের ছাত্রসমাজ চরম ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। বিশেষ করে চিকিৎসা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আয়োজিত জাতীয় পরীক্ষাগুলোতে অনিয়মের অভিযোগে দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, দেশের কোটি কোটি তরুণ ও শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান এবং শিক্ষাজীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ার কারণে সরকার বিরোধী এই ক্ষোভ ক্রমেই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মুম্বাইয়ের এই ব্যতিক্রিমি ভাইকিং রো বিক্ষোভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, এই ধরনের উদ্ভাবনী আন্দোলন এবং জন অসন্তোষের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা খাতে কোনো বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল আনবে নাকি প্রচলিত তদন্ত প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিক্ষোভকারী সংগঠনের নেতারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, মন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এবং প্রশ্ন ফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজধানী নতুন দিল্লি সহ দেশের অন্যান্য প্রধান শহরেও একই ধরনের কর্মসূচি সম্প্রসারিত করবেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল গঠন করলেও আন্দোলনকারীরা তা পর্যাপ্ত নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিবাদের ধরণে এমন বিশ্বজনীন ট্রেন্ডের মিশ্রণ ভারতে ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে খবরটি গুরুত্বের সাথে স্থান পাওয়ায় সরকারের ওপর নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সুবিচার নিশ্চিত করাই এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
