বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

কাশ্মীরের অধিকারকর্মী খুররাম পারভেজ জামিনে মুক্তি পেলেন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

কাশ্মীরের অধিকারকর্মী খুররাম পারভেজ জামিনে মুক্তি পেলেন

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির একটি কারাগার থেকে দীর্ঘ বন্দিদশার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন কাশ্মীরের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী খুররাম পারভেজ এবং স্বাধীন সাংবাদিক ইরফান মেহরাজ, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আল জাজিরা। সুদীর্ঘ সময় ধরে বিচারহীনভাবে কারাগারে আটকে রাখার পর দিল্লি আদালতের নির্দেশে বুধবার রাতে তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ তাদের গ্রেপ্তার করেছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এটি ২০১৯ সালে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর থেকে স্বাধীন কণ্ঠস্বর ও সাংবাদিকদের ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চলমান দমনেরই অংশ।

জম্মু কাশ্মীর কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি বা জেকেসিসিএস-এর সমন্বয়ক খুররাম পারভেজকে ২০২১ সালের নভেম্বরে শ্রীনগরের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপরদিকে সংস্থাটির গবেষক ও সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ইরফান মেহরাজকে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আটক করে ভারতীয় সংস্থাটি। ভারতের বিতর্কিত কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-এর অধীনে তাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডা প্রচার এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে অর্থায়নের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই আইনের সুযোগ নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যেকোনো ব্যক্তিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিনা বিচারে আটকে রাখতে পারে। খুররাম পারভেজ ও ইরফান মেহরাজ শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

নতুন দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্ট গত ১৮ জুলাই এই দুই মানবাধিকারকর্মীকে জামিন মঞ্জুর করে আদেশ জারি করে। নিম্ন আদালতের বিচারক পীতাম্বর দত্ত রায়ে উল্লেখ করেন যে, আসামীদের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অভিযোগপত্র জমা হলেও এখনো বিচার প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। এনআইএ-এর পক্ষ থেকে আনা অভিযোগগুলো মূলত মৌখিক সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আদালতে যাচাই সাপেক্ষ। দীর্ঘ আটকের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত জামিনের আদেশ দেন। তবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ নিম্ন আদালতের এই জামিনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে অবিলম্বে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন জানায়।

দিল্লি হাইকোর্ট গত ২২ জুলাই এনআইএ-এর জামিন স্থগিতের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও দুইজনের ওপর চরম কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, তাদের নিজ জামিননামা বাবদ দুই লাখ রুপি জমা দিতে হবে এবং তাদের পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে সমর্পণ করতে হবে। একই সাথে বিচার কাজ চলাকালীন তারা কোনোভাবেই অনুমতি ছাড়া দিল্লির বাইরে যেতে পারবেন না, যার ফলে তারা নিজেদের জন্মভূমি কাশ্মীরে ফিরতে পারছেন না। পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন এনআইএ-এর তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এবং ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন এগেইনস্ট টর্চার যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, খুররাম পারভেজ এক হাজার ৭০৩ দিন এবং ইরফান মেহরাজ এক হাজার ২১৯ দিন বিনা বিচারে বন্দী ছিলেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহের অপরাধে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা দুটি দাবি করেছে। পারভেজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাশ্মীরের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য বিশদভাবে তুলে ধরার জন্য পরিচিত ছিলেন এবং ২০২৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ মার্টিন এনালস পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী দিনগুলোতে দিল্লি হাইকোর্টে এই মামলার আপিল শুনানিতে কী পরিণতি ঘটে এবং এনআইএ তাদের জামিন বাতিলের চেষ্টায় কতটা সফল হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে দিল্লির বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় আসামিরা ৮০০ কিলোমিটার দূরে নিজেদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সুদীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই দুই মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের আইনি লড়াই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

banner
Link copied!