নরওয়ের ফুটবল প্রধান লিসে ক্লাভনেস ফিফার নীতিশাস্ত্র কমিটির কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বৃহস্পতিবার দ্য টাইমস পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বার্তা সংস্থা এএফপি নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের শাস্তি স্থগিত করার বিষয়ে ফিফার নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পর এই পদক্ষেপর কথা ঘোষণা করা হয়। ক্লাভনেস জানিয়েছেন যে তিনি আগামী ছয়ই আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করবেন এবং বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ দাখিল করা হবে।
বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে বোসনিয়া ও হার্জেগোভিনের বিরুদ্ধে খেলা চলাকালীন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে ফাউল করার অপরাধে ৬৪ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুন। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী লাল কার্ডের কারণে তার পরবর্তী ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার কথা ছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরাসরি ফোন করার পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি এক বিশেষ সিদ্ধান্ত বলে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের স্থগিতাদেশের অধীনে স্থগিত ঘোষণা করে। এর ফলে শেষ ষোলোর খেলায় বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পান বালোগুন, যদিও ওই ম্যাচে মার্কিন দল চার-এক গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
ফুটবলের মৌলিক নিয়ম ভাঙার বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে লিসে ক্লাভনেস জানান যে রাষ্ট্রপ্রধানদের রাজনৈতিক স্বার্থে ফুটবল খেলার নিয়মকে বাঁকানো হলে তা পুরো খেলাধুলার অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। শৃঙ্খলা কমিটির একক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল-কামালির নেওয়া এই সিদ্ধান্ত কোনো অন্যায় প্রক্রিয়া বা বাহ্যিক চাপের ফসল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। ক্লাভনেস স্পষ্ট করে বলেন যে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপের মুখে নিয়ম বদলে ফেলা একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এর আগেও ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো কর্তৃক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে একটি নৈতিক অভিযোগ জমা দিয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বালোগুন বিতর্ককেও সেই একই নৈতিক অভিযোগের অংশ হিসেবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্লাভনেসের মতে, এই ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সময় আরও বেশি কর্মকর্তার মতামত নেওয়া উচিত ছিল এবং কোনো অবস্থাতেই একক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে মেনে নেওয়া যায় না। ফুটবলের সততা রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভেতরে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ফুটবল বিশ্বের সাবেক খেলোয়াড় এবং পেশায় আইনজীবী ক্লাভনেস বলেন যে এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে যা সহজেই ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে কোচ, খেলোয়াড় এবং সমর্থকরা সবাই তীব্রভাবে অনুভব করেছেন খেলাটির ভেতরে রাজনীতির ছায়া কতটা কাছাকাছি চলে এসেছে। যদিও এই ঘটনা মার্কিন দলকে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে জয় এনে দিতে পারেনি, তবুও এটি ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত নজির হিসেবে রয়ে গেল। যা কম স্পষ্ট তা হলো ফিফা এই অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের নৈতিক সততা প্রমাণ করতে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ৬০ বছরের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক নেতার ফোনের ভিত্তিতে কোনো খেলোয়াড় বা দলের লাল কার্ডের শাস্তি স্থগিত করার ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। একই সাথে ফিফা কর্তৃক টুর্নামেন্টের পরিধি ৪৮ দল থেকে বাড়িয়ে ৬৪ দলে রূপান্তরের যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, সেটির বিষয়েও ক্লাভনেস অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে হঠাৎ করে বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন ফুটবলের মৌলিক আকর্ষণ এবং পেশাদার লিগগুলোর কাঠামোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এখন পুরো ক্রীড়া বিশ্বের প্রধান দাবি।
