বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইরানে মার্কিন হামলায় স্কুল ধ্বংস, নিহত শতাধিক শিশু

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

ইরানে মার্কিন হামলায় স্কুল ধ্বংস, নিহত শতাধিক শিশু

ছবি : সংগৃহীত

ইরানের মিনাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় একশো বিশটি শিশুসহ মোট একশো ছাপ্পন্ন জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ। গত ছাব্বিশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সূচনালগ্নে সংঘটিত এই ট্র্যাজেডি বেসামরিক প্রাণহানির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ একক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় ভবনটির ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এখনও উদ্ধারকাজ ও নিহতের অবশেষ খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা। হামলার তীব্রতায় ভবনটির ওপরের তলা সম্পূর্ণ ধসে নিচে নেমে পড়ে এবং পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

তদন্তকারী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাস্থলের পাশেই অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশারি গার্ড কর্পসের একটি কম্পাউন্ডকে লক্ষ্য করে চালানো সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিদ্যালয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই হামলার দায় সরাসরি স্বীকার না করলেও, মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে যে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের পুরনো বা ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের কারণে এই বেসামরিক স্থাপনাটিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ভুল করা হয়েছিল। হামলার সময় বিদ্যালয়টি চালু ছিল এবং পবিত্র রমজান মাসের অংশ হিসেবে শিশুরা প্রার্থনা কক্ষে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতে ব্যস্ত ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। হামলার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব বা সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তারা উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দিলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

বিদ্যালয়টির প্রথম শ্রেণির শিক্ষক আমাইনেহ নদীমি সেই মর্মান্তিক মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান যে হামলার ঠিক আগে প্রধান শিক্ষক স্কুল ছুটির ঘোষণা দিয়েছিলেন। অভিভাবকরা দ্রুত সন্তানদের বাড়ি ফিরিয়ে নিতে ছুটে আসেন এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট শব্দে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যালয় ভবনটিতে আঘাত হানে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো চত্বর ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শিক্ষিকা আমাইনেহ তার ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও বিস্ফোরণের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে অনেকে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েন। তিনি নিজেও আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সহকর্মীদের সহায়তায় গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং অভিভাবকদের দিগ্বিদিক ছুটতে দেখেন।

উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পান যে ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মানুষের দেহাবশেষ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে তাদের পরিবারের সদস্যদের পরিহিত জুতো বা পোশাক দেখে শনাক্ত করতে হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন যে তারা ঘটনাস্থলে এসে কাউকে জীবিত পাননি এবং স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মীরা জানান যে রাতের পর রাত তাদের চোখের সামনে সেই ভয়াবহ দৃশ্য ভেসে বেড়ায়। নিহত শিশুদের মায়েরা প্রতিদিন বিকেলে সমাধিস্থলে এসে তাদের কবরের পাশে বসে অশ্রু বিসর্জন দেন এবং বিচার দাবি করেন।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের বিবৃতির বিরুদ্ধে এটি একটি বড় নৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এমনকি আলোচনায় অংশ নেওয়া একটি বিমানের নামকরণও এই ঘটনার স্মরণে করা হয়েছে যা তেহরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। মার্কিন সেন্টকমের প্রধান কংগ্রেসীয় কমিটিতে এই তদন্তকে জটিল বলে উল্লেখ করলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই দাবিকে ভিত্তিহীন বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে সংলগ্ন সামরিক কম্পাউন্ডটি বহু বছর আগে থেকেই মূলত চিকিৎসা কেন্দ্র বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হতো এবং স্কুলটি আলাদা প্রাচীর ঘেরা একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল যার ঠিকানা অনলাইনেও উন্মুক্ত ছিল।

নিহত শিশুদের পরিবার ও স্বজনরা আজও ন্যায়বিচারের আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন এবং তাদের এই ক্ষোভ যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতাকে নতুন করে উন্মোচন করেছে। শিক্ষিকা আমাইনেহ প্রতিদিন তার ভাঙা বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ও শিক্ষার্থীদের কবরের পাশে গিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। নয় বছর বয়সী সেতায়েশ নামের একটি শিশুর মা প্রতিদিন রাত অবধি কবরের পাশে বসে থাকেন এবং তার মেয়ের খেলনা পুতুল সাজিয়ে শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্নের কথা স্মরণ করেন। শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে যারা প্রতিদিন সকালে স্কুলে এসেছিলেন, তাদের এই মর্মান্তিক পরিণতি পুরো অঞ্চলের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

এই ভয়াবহ হামলার প্রভাব কেবল মিনাব শহরের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমগ্র ইরানি সমাজের মনস্তত্ত্বে গভীর দাগ কেটেছে। সংঘাতের শুরুতেই সাধারণ মানুষের এমন করুণ মৃত্যু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবাধিকার সংক্রান্ত নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বহু নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনার স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে যাতে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। যুদ্ধের এই বিভীষিকা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে প্রিয়জন হারানোর তীব্র বেদনায় জর্জরিত করেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। শোকাহত পরিবারগুলোর কান্না আর ধ্বংসস্তূপের স্তূপে পরিণত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

banner
Link copied!