বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

রুশ এলএনজি নিষেধাজ্ঞায় গ্রিসের আপত্তি ও ইউক্রেন নীতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২২, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

রুশ এলএনজি নিষেধাজ্ঞায় গ্রিসের আপত্তি ও ইউক্রেন নীতি

ছবি : সংগৃহীত

ইউক্রেনকে সামরিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি রাশিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে গ্রিস, বুধবার আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের ২১তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ চূড়ান্ত করার চেষ্টা করলেও গ্রিসসহ কয়েকটি সদস্য দেশের আপত্তির কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত মোট বাণিজ্যিক জাহাজের প্রায় ৬০ শতাংশের মালিকানা গ্রিক ব্যবসায়ীদের হাতে থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তাদের সমুদ্র পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সাথে গ্রিসের অর্থনীতিতে সমুদ্র পরিবহন ও পর্যটন খাত মিলে মোট দেশজ উৎপাদনের ২৫ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে, যা দেশটির নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের মে মাসে গ্রিসের আয়নিয়ান সাগরের লেফকাদা দ্বীপের একটি উপকূলে বিস্ফোরক ভর্তি একটি ইউক্রেনীয় চালকবিহীন নৌ ড্রোন উদ্ধারের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়। রাশিয়ার তথাকথিত ছায়া বহরের তেলবাহী জাহাজে আক্রমণের জন্য ইউক্রেন এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে আসছিল, যা গ্রিক সামুদ্রিক সীমানায় পরিবেশগত বিপর্যয় ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে। গ্রিক সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের সমুদ্রসীমা যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলে কিয়েভ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার আশ্বাস দেয়। এই ঘটনার পর গ্রিসের উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী হারিস থিওহারিস ইউক্রেন পুনর্গঠনে সহায়তা বিষয়ক প্রথম স্মারক স্বাক্ষর করেন, যার অধীনে গ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মৌলিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

জার্মানির কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী, গ্রিস এ পর্যন্ত ইউক্রেনকে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহায়তা হিসেবে ১৭ কোটি ইউরো প্রদান করেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আরও ১১৪ কোটি ইউরো সামরিক ও আর্থিক সহায়তা এবং ৯০ লাখ ইউরো মানবিক সাহায্য দিয়েছে দেশটি। সাবেক দেউলিয়া অবস্থা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নিজেদের জাতীয় বাজেট ভারসাম্য রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও গ্রিস এই সহায়তা নিশ্চিত করেছে। তবে রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড যুদ্ধ ও সাইবার হামলার ভয় গ্রিসকে আরও বেশি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরে সতর্ক করে তুলেছে। বিশেষ করে আগামী শরৎ থেকে ২০২৭ সালের শুরুর দিকের মধ্যে গ্রিসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা নিয়ে রাশিয়ার অপপ্রচার ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অ্যাথেন্সে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিয়ারিয়াকোস মিটসোটাকিস যৌথ ঘোষণায় সামুদ্রিক ড্রোন তৈরি ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা বৃদ্ধির যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। তবে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে গ্রিস এখনো সেই চুক্তির বাস্তবায়নে ধীরগতি নীতি অনুসরণ করছে। গ্রিক সরকারি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে যৌথভাবে উৎপাদিত ড্রোন রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবহৃত হলে মস্কো গ্রিসের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিশোধ নিতে পারে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের কূটনৈতিক আলোচনায় পৌঁছাবে, তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অ্যাথেন্স কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব স্ববিরোধী নীতি বজায় রেখে কীভাবে গ্রিস তার অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ইউক্রেনের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে, অথচ সদস্য দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অ্যাথেন্সের এই সতর্ক ও ধীরগতির পদক্ষেপ ইউক্রেনীয়দের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি করলেও দেশটি ইউরোপীয় ঐক্য বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।

banner
Link copied!