ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমের হিমালয় অঞ্চলে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গ ধসে অন্তত দশ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সতেরো জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে আল জাজিরা, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করেছে। ভুটান ও তিব্বত সীমান্তের কাছে সমারদং গ্রামে সোমবার এই দুর্ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের পাঁচশো মেগাওয়াট ক্ষমতার তিস্তা নদী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গটিতে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বরাতে জানা গেছে যে ধ্বংসস্তূপ সুড়ঙ্গের ভেতরে আছড়ে পড়ার ঠিক আগে তারা একটি তীব্র শব্দ শুনতে পান।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে সুড়ঙ্গের ভেতরের পাথরে আটকা থাকা বা প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা মিথেন গ্যাসের হঠাৎ বিস্ফোরণের ফলেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জাতীয় হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের ছয়জন কর্মকর্তা উদ্ধারে সহায়তা করার জন্য সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং তারাও ভেতরে আটকা পড়েন। স্থানীয় পুলিশ প্রধান সোনম ডোলমা জানিয়েছেন যে উদ্ধারকর্মীরা এখন পর্যন্ত দশটি মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন এবং আরও সতেরো জন ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতীয় দুর্যোগ সাড়া দান বাহিনীসহ বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের কারণে মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারী কর্মকর্তা নিতিন কুমার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে সুড়ঙ্গের ভেতর মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিপজ্জনক বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। উদ্ধারকারীরা বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য বিশেষ শ্বাসযন্ত্র ব্যবহার করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। হিমালয় অঞ্চলে ভূকম্পন প্রবণতা এবং অপ্রত্যাশিত ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতির কারণে এ ধরনের সুড়ঙ্গ নির্মাণ কাজ সব সময়ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এর আগে ২০২৩ সালে উত্তরাঞ্চলীয় উত্তরাখণ্ড রাজ্যে একটি সুড়ঙ্গের অংশ ধসে পড়ার পর একচল্লিশ জন শ্রমিক দীর্ঘ সতেরো দিন আটকা থাকার পর উদ্ধার হয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন যে তিস্তা নদী অববাহিকা অঞ্চলটি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং এখানকার তরুণ ও ভঙ্গুর শিলা গঠনে বিভিন্ন ফাটল রয়েছে। এই ভূগর্ভস্থ পকেটগুলোতে গ্যাস জমা হওয়ার প্রবণতা থাকে যা পরবর্তীতে এ ধরনের ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিষাক্ত গ্যাসের কারণে উদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের পরিবার ও স্বজনরা সুড়ঙ্গ মুখের বাইরে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সুড়ঙ্গ নির্মাণে আরও কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সতর্কতা অবলম্বনের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। উদ্ধার অভিযান সফল না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলে উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা দলগুলোর তৎপরতা পূর্ণ মাত্রায় বজায় থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
