মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের ওপর পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজ জানিয়েছে যে মার্কিন পণ্যের ওপর কানাডার কথিত বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ত্রিশ দিনের মধ্যে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই নতুন শুল্কের আওতায় ওয়াইন, হকি স্টিক এবং সিমেন্টের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি বেশ কিছু শিল্পজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ এবং মাছের মতো কিছু প্রধান রপ্তানি পণ্যকে এই কঠোর শুল্কের আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিগত জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে বিভিন্ন পরিবর্তন এনেছেন। এর অংশ হিসেবে প্রণীত নতুন এই শুল্ক আরোপকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই পরিস্থিতির জবাবে জানিয়েছেন যে তার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা আরও জোরদার করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন যে এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির পরিপন্থী। ইতিমধ্যে কানাডার পক্ষ থেকে মার্কিন পণ্যের ওপর পূর্বে আরোপিত শুল্ক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওন্টারিও প্রদেশের প্রধানসহ দেশটির অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারাও এই মার্কিন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কানাডার পক্ষ থেকে মার্কিন গাড়ি, ডেইরি পণ্য এবং অ্যালকোহলের ওপর বৈষম্যমূলক কর আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন মোটরযানের ওপর অতিরিক্ত কর এবং কানাডার ডেইরি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দীর্ঘ দিন ধরে ওয়াশিংটনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া গত বছর কানাডা মার্কিন পণ্যের ওপর যে প্রতিক্রিয়াশীল শুল্ক আরোপ করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই উত্তপ্ত পরিবেশকে আরও ঘনীভূত করেছে। উভয় পক্ষের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে উত্তর আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্য ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই জটিল পরিস্থিতিতে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই ধরনের বড় অংকের শুল্ক দুই দেশের সাধারণ অর্থনীতি এবং ভোক্তা বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় দেশের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিরা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা চালালেও পারস্পরিক আস্থার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যদি কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী ধাক্কা অনুভূত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্কে এই শুল্ক নীতির কারণে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান এই বাণিজ্য বিরোধ উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তারাও নতুন ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে দ্রুত কোনো ইতিবাচক সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
