ইউক্রেনের সামরিক প্রধান অল্ল্যাক্সান্দর সীরস্কিকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মাঝে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এটি অন্যতম বৃহৎ একটি রদবদল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজধানী কিয়েভে গত কয়েক দিন ধরে চলা তুমুল বিক্ষোভ এবং প্রভাবশালী প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আকস্মিক অপসারণের পর এই ঘোষণাটি আসে। আল জাজিরা এবং শারজাহ ২৪-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ষাট বছর বয়সী সীরস্কি সোভিয়েত রাশিয়ায় জন্মগ্রহণের পর মস্কোর একটি সামরিক অ্যাকাডেমিতে শিক্ষা লাভ করেন। আশির দশকে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ তৎকালীন ইউক্রেনে মোতায়েন করা হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বাধীন ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং দেশের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে রুশ আগ্রাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে কিয়েভ রক্ষায় সফল নেতৃত্ব দেওয়ায় তাকে দেশটির সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল। এছাড়া একই বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনের সফল পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনাও তিনি করেছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে মিখাইলো ফেডোরভের অপসারণের পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ফেডোরভ সামরিক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পক্ষে জোর দিলেও সীরস্কি এবং তার জেনারেল স্টাফ সেই পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন স্থানে টানা ছয় দিন ধরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের এই বিক্ষোভ ইউক্রেনীয় প্রশাসনের ওপর গভীর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।
এই রাজনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থা কাটাতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে মিখাইল দ্রাপাতিককে নিয়োগ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি সীরস্কির বিগত দিনের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সামনের দিনে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি আরও সুসংহত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য, যা রাশিয়াকে বাধ্য করবে শান্তিপূর্ণ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব নতুন কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা করতে চাইছে। চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ধাক্কায় উভয় পক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর আগে রাশিয়াও তাদের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা ও কৌশলগত কারণে একাধিক শীর্ষস্থানীয় জেনারেলকে বরখাস্ত করেছিল। ইউক্রেনের এই সাম্প্রতিক নেতৃত্ব বদল যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপ্রকৃতি কতটা পাল্টাতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষা করা জেলেনস্কি প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
