যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে দেশের অতি-ধনী ব্যক্তিবর্গের ওপর করের পরিমাণ বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়ে একটি খোলা চিঠি প্রদান করেছেন দেশটির অন্তত ১২০ জন মিলিয়নিয়ার, বার্তা সংস্থা আল জাজিরা এবং অ্যানাদোলু এজেন্সি নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই প্রকাশিত প্রাউড টু পে শীর্ষক এই যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তারা দেশের জাতীয় পুনর্গঠন ও জনসেবার স্বার্থে নিজস্ব সম্পদের ওপর অতিরিক্ত কর প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সাবেক পেশাদার ফুটবল তারকা ও জনপ্রিয় সম্প্রচারক গ্যারি লিনেকার এবং বিশিষ্ট সঙ্গীত প্রযোজক ব্রায়ান ইনোসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন। প্রচারণাকারী গোষ্ঠী প্যাট্রিয়টিক মিলিয়নেয়ার্স ইউকে-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, দীর্ঘ দিন ধরে দেশের সম্পদ ও ক্ষমতা গুটি কয়েক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, দেশের ১ কোটি পাউন্ডের বেশি ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর বার্ষিক ২ শতাংশ হারে নতুন একটি সম্পদ কর চালু করা উচিত। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল এই একক পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরকার প্রতি বছর প্রায় ২,৪০০ কোটি পাউন্ড অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে। উপরন্তু, ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স বা সম্পদ বিক্রির অর্জিত মুনাফার ওপর কর কাঠামো সংস্কার করে তা সাধারণ আয়ের করের সমকক্ষে নিয়ে এলে বছরে আরও ১,২০০ কোটি পাউন্ড সংগ্রহ করা সম্ভব। প্যাট্রিয়টিক মিলিয়নেয়ার্স মনে করে, শ্রমজীবী মানুষ যারা প্রতিদিন পরিশ্রম করে আয় করেন তাদের ওপর কর বাড়ানোর পরিবর্তে যাদের প্রধান আয় আসে পুঞ্জীভূত সম্পদ থেকে, তাদের ওপরই প্রধানত এই করের বোঝা থাকা যৌক্তিক।
বিবৃতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সাবেক ইংলিশ ফুটবল অধিনায়ক গ্যারি লিনেকার বলেন যে, যুক্তিসঙ্গত কর প্রদান করা প্রতিটি ব্রিটিশ নাগরিকের একটি মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব হলেও দেশের সাধারণ মানুষকে আজ তাদের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব দিতে হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সমাজে চরম বৈষম্য দূর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক ব্রিটেন নির্মাণ করতে হলে নতুন সরকারের উচিত বিপুল সম্পদের ওপর যুক্তিসঙ্গত কর আরোপ করা। চলচ্চিত্র পরিচালক রিচার্ড কার্টিস এবং খ্যাতনামা বেকারি চেইন গ্র্যাগস-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ান গ্র্যাগসহ বহু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এই চিঠিতে সম্মতি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ধনীদের অলস পড়ে থাকা মূলধনকে যদি জাতীয় অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণে কাজে লাগানো যায়, তবে সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক চেহারা দ্রুত বদলে যাবে।
এই চিঠির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি বিভাগের চিফ সেক্রেটারি এমা রেনল্ডস টেলিভিশন চ্যানেল স্কাই নিউজকে জানান যে, বিত্তবান নাগরিকেরা নিজ থেকে বেশি কর দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করাকে সরকার ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানাচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, যেকোনো প্রধান কর নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা কেবল আগামী জাতীয় বাজেটের সময়ই গ্রহণ করা সম্ভব। সরকারি প্রচলিত ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, বর্তমানে ইচ্ছুক ব্যক্তিবর্গ চাইলে সরকারি তহবিলে স্বেচ্ছায় দান করতে পারেন, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পদ কর চালু করার সিদ্ধান্ত পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর সার্বিক পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই নতুন দাবি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব এবং রক্ষণশীল চিন্তাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, অতিরিক্ত সম্পদ কর আরোপ করা হলে তা মূলধন পাচার এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনীহা তৈরি করতে পারে। তবে প্রস্তাবের সমর্থকরা এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেছেন যে, বেশিরভাগ ধনী নাগরিকই উচ্চমানের সরকারি পরিষেবা ও স্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশের স্বার্থে দেশে অবস্থান করেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম তার অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডায় এই প্রস্তাবিত ২ শতাংশ সম্পদ কর যুক্ত করবেন নাকি প্রচলিত কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। তবে সরকারের শুরুর সপ্তাহে এই প্রভাবশালী উদ্যোগ নতুন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
