অধ্যুষিত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের পূর্বে অবস্থিত বাইত ফুরিক শহরে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনি কৃষিজমিতে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের দেওয়া আগুন নেভানোর চেষ্টা করার সময় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর সরাসরি গুলিতে অন্তত চার ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ নিজেদের হেফাজতে আটকে রেখেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী, যা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বাইত ফুরিক শহরের মেয়র ইউসুফ হানানি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, স্থানীয় ফিলিস্তিনি অধিবাসীরা তাদের চারপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ আগুন থেকে ফসল ও জলপাই বাগান রক্ষা করতে ছুটে এসেছিলেন। অবৈধ এলোন মোরে বসতির কাছে অবস্থিত দেরেক আব্রাহাম ফাঁড়ির ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা পরিকল্পিতভাবে ওই ফিলিস্তিনি জমিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি অধিবাসীরা যখন অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই ইসরায়েলি সেনাসদস্য ও বসতি স্থাপনকারীরা যৌথভাবে তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে ফিলিস্তিনিরা কেবল আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনিদের একটি দল তাদের কৃষিজমিতে নিজেরাই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ওপর চড়াও হয়েছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় এক ইসরায়েলি নাগরিক ছুরিকাহত হন এবং তাকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে যে, নিজেদের পৈতৃক জমিতে লাগা আগুন নেভাতে গিয়েই ফিলিস্তিনি নাগরিকরা উল্টো সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন।
দখলকৃত পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হিংসাত্মক আক্রমণ নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ফসল বোনা ও সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংস করতে জলপাই বাগান ও ফসলি জমিতে আগুন দেওয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই বেআইনি হামলার নিন্দা জানালেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিহত দুই ফিলিস্তিনি যুবকের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে কবে হস্তান্তর করবে। ফিলিস্তিনি নিহতদের মরদেহ আটকে রেখে দর কষাকষি করার ইসরায়েলি নীতি দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম চরম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ঘটনার পর থেকে বাইত ফুরিক এবং নাবলুস অঞ্চলের অন্যান্য গ্রামে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন যে আগামী দিনগুলোতে বসতি স্থাপনকারীদের এই জাতীয় আক্রমণ আরও তীব্র হতে পারে, যা সমগ্র অঞ্চলকে নতুন করে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।
