যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এডিস মশাবাহিত মরণঘাতী ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে এডেনভিত্তিক রোগ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইইডিইডব্লিউএস এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৭,৮১৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং অন্তত ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির উপকূলীয় শহর মুকালাসহ হাদরামাউত, এডেন, আবিয়ান, শাবওয়া এবং তায়েজ প্রদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে ভেঙে পড়া ইয়েমেনের স্বাস্থ্য খাতের ওপর এই নতুন সংকট অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
উপকূলীয় বন্দর নগরী মাকালার আল-কুদ নামের একটি ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমানো পানি পরীক্ষা করছেন এবং মশার লার্ভা ধ্বংসের চেষ্টা চালাচ্ছেন। জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কীট নজরদারি কর্মকর্তা সালিম বিন শাবাজ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে এয়ার কন্ডিশনার থেকে পড়া পানি ও খোলা হাউজের জমানো পানিতে প্রচুর পরিমাণে এডিস ও অ্যানোফিলিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। দুই মাস আগে ওই এলাকায় স্প্রে এবং সচেতনতামূলক অভিযান চালানো হলেও বাসিন্দাদের অসচেতনতার কারণে পুনরায় মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অনেক সময় বাড়ির মালিকদের অনুপস্থিতি বা খোলা পানির পাত্র ঢেকে না রাখার অবহেলার কারণে মশা নিধন অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ইয়েমেনের হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ভিড় উপচে পড়ছে এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। মুকালা শহরের সরকারি ইবনে সিনা হাসপাতালের ল্যাবরেটরি প্রধান মোহাম্মদ ওমর জানান যে গত মে মাসে প্রাদুর্ভাবের শীর্ষে থাকার সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টার একটি শিফটে ৬৫ জনেরও বেশি সম্ভাব্য ডেঙ্গু রোগীর নমুনা পরীক্ষা করতে হয়েছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ল্যাব পরীক্ষার সুবিধা থাকায় দূরদূরান্ত থেকে দরিদ্র মানুষ এখানে ভিড় করছেন। তবে অর্থাভাব এবং সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী একদম শেষ পর্যায়ে রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন, যার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও সরকারি সেবার অচলাবস্থার কারণে ইয়েমেনে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বাসাবাড়িতে খোলা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। হাদরামাউত বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি মেডিসিনের অধ্যাপক আবদুল্লাহ বিন গউস জানান যে ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা টিকা না থাকায় শুধুমাত্র রোগীর উপসর্গ নিরাময় এবং তরল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জমে থাকা পানি এবং উচ্চ আর্দ্রতার কারণে এই রোগটি ওই এলাকায় চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে।
প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ ছিটানো এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় তহবিলের তীব্র অভাব রয়েছে। শাবওয়া প্রদেশের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের প্রধান মোহাম্মদ সালেম হাদি জানান যে সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া এবং ভ্রান্ত ধারণার কারণে গ্রামাঞ্চলের রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কার্যকর তহবিল ছাড়া এই পুনরাবৃত্তিমূলক ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে কি না। আপাতত সীমিত সম্পদ নিয়েই ইয়েমেনের চিকিৎসাকর্মীরা মরণঘাতী এই মহামারির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
