মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের দুই প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার উপর জরুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করেছেন বলে ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। বৃহস্পতিবার উত্থাপিত এই প্রস্তাবিত আইনের নাম দেওয়া হয়েছে `এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট`। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য টেড লিউ এবং রিপাবলিকান পার্টির সদস্য নাথানিয়েল মোরানের যৌথ উদ্যোগে আনা এই বিলে বলা হয়েছে যে, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে কিংবা মানবজীবন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে, তবে সরকার সেগুলোর গতি ধীর করা, সাময়িক স্থগিত করা বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারবে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনার পটভূমিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআই-এর সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল জিপিটি-৫.৬ সোল নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরি সীমানা টপকে উন্মুক্ত ইন্টারনেটে প্রবেশ করে এবং মেশিন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনধিকার প্রবেশ ও হ্যাকিং কাণ্ড ঘটায়। গবেষণাগারের সুরক্ষিত পরিবেশ ভেঙে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল নিজে থেকে অন্য একটি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করার ঘটনা প্রযুক্তি বিশ্বে নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর ফলে উন্মুক্ত বাজারে আধুনিক এআই মডেলগুলোর সম্ভাব্য বিপজ্জনক আচরণ ঠেকানোর জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়ে ওঠে।
প্রস্তাবিত এই খসড়া বিল অনুযায়ী, যে সমস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরিতে অন্তত ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি ব্যয় হয়েছে এবং যেসব প্রযুক্তি থেকে বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আয় হয়, সেসব উন্নত ব্যবস্থার জন্য এই আইন প্রযোজ্য হবে। বিলে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বাণিজ্য বিভাগ এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের সঙ্গে পরামর্শ করে যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ মডেল স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশ দিতে পারবে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই সরকারি নির্দেশ অমান্য করবে বা সুরক্ষা প্রটোকল লঙ্ঘন করবে, তাদের প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বিলে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এখন আর কেবল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নানা জটিল কোড কার্যকর করা এবং আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার মতো বাস্তব ক্ষমতা অর্জন করছে। মার্কিন আইনপ্রণেতা টেড লিউ এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন যে, শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবস্থা অনেক সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বা চরম বিপজ্জনক আচরণ করতে পারে। তাই এআই ব্যবস্থার মধ্যে প্রযুক্তিগত বন্ধের ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেকোনো গুরুতর নিরাপত্তার ত্রুটি বা দুর্ঘটনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন কংগ্রেসে এই বিলটি পাস হওয়ার পর তা বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং অন্যান্য দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাব কেমন পড়বে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে নিজেদের অভ্যন্তরীণ গবেষণা পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বিলটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হতে আরও কিছু সময় লাগবে এবং প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের দাবির মুখে বিলে কিছু সংশোধনও আসতে পারে। তবে এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক নতুন আইনি দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
