ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিখ্যাত বর্দো শহরের সংলগ্ন বনাঞ্চলে ভয়াবহ ফ্রান্স দাবানল মারাত্মক আকার ধারণ করায় রবিবার অন্তত ৫৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ ও বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। তীব্র তাপদাহ ও অস্বাভাবিক বাতাসের কারণে নিয়ন্ত্রণহীন এই আগুন ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জিরোন্ড অঞ্চল এবং সংলগ্ন পাঁচটির বেশি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলেই স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার অতিক্রম করেছে বলে নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা এপি নিউজ।
বর্দো শহরের মেয়র থমাস কাজেন্যাভ জানিয়েছেন যে আগুনের শিখা বর্তমানে শহরের বহির্ভাগ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরের একটি বিশাল প্রদর্শনী কেন্দ্রকে হাজার হাজার গৃহহীন মানুষের জন্য জরুরি আশ্রয়শিবিরে রূপান্তর করা হয়েছে। তবে এখনই পুরো বর্দো শহর খালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ সতর্ক করে বলেছেন যে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের জন্য রাতটি অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং আবহাওয়া এখনো একেবারেই প্রতিকূলে রয়েছে। ঝোড়ো বাতাসে আগুন নিজস্ব ঘূর্ণিবায়ু তৈরি করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গতি পরিবর্তন করছে।
চলতি সপ্তাহের আগুনে কেবল জিরোন্ডের উপকূলীয় পাইন বন ও তৎসংলগ্ন প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর এলাকা ভস্মীভূত হয়েছে, যা প্যারিস শহরের আয়তনের প্রায় চারগুণ। বছরের শুরু থেকে হিসাব করলে ফ্রান্স দাবানল পরিস্থিতিতে পুড়ে যাওয়া বনভূমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে কাজ করছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী, ১ হাজার ৫০০ সেনা সদস্য এবং ১ হাজার ২০০ পুলিশ কর্মকর্তা। তাদের সহায়তা করছে সুইজারল্যান্ড থেকে আসা বিশেষ দল। আগুন নেভাতে বেশ কিছু বিশেষ বিমান ও হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক পানি ফেলছে। নিরাপত্তার স্বার্থে স্পেনের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ এ৬৩ মহাসড়কের ৬০ কিলোমিটার এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে দেশটির আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও। রাজধানী প্যারিসে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী `ট্যুর দ্য ফ্রান্স` সাইক্লিং প্রতিযোগিতার সমাপনী পর্বের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে, যাতে সেখান থেকে নিরাপত্তাকর্মীদের সরিয়ে নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে মোতায়েন করা যায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাকরঁ দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনেও দাবানল পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেশটির রাজধানী মাদ্রিদ, আভিলা এবং ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের সংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে ৯০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভ্যালেন্সিয়ার আঞ্চলিক প্রধান হোয়ানফ্রান পেরেস জোর দিয়ে বলেছেন যে আগুন নেভানোর ক্ষমতা বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। স্পেনে আগুনে ১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ফ্রান্সে ২ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো শুষ্ক আবহাওয়া ও অতিরিক্ত তাপদাহের এই প্রবাহ আরও কত দিন অব্যাহত থাকবে এবং বাতাসের গতিবেগ কবে কমবে। স্পেন ও ফ্রান্সের সরকার প্রধানরা একে জলবায়ু পরিবর্তনের এক নজিরবিহীন জরুরি সংকট হিসেবে উল্লেখ করে ঐক্যবদ্ধ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
