রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

কাস্পিয়ান সাগরে হামলা, ইউক্রেনকে ইরানি সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

কাস্পিয়ান সাগরে হামলা, ইউক্রেনকে ইরানি সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি

কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক পণাবাহী জাহাজে ইউক্রেন সামরিক হামলা চালিয়েছে বলে শনিবার নিশ্চিত করেছে ইরান সরকার, যার খবর প্রকাশ করেছে আল জাজিরা ও রয়টার্স। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে উত্তর উপকূলের কাছে কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নাবিক নিহত এবং অন্য এক নাবিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও মারাত্মক ঘটনার পর শনিবার রাতে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিপি হস্তান্তর করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরেশিয়া বিষয়ক মহাপরিচালক ইউক্রেনীয় কূটনীতিককে জানান যে আন্তর্জাতিক বেসামরিক জলসীমায় নিরপরাধ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের চতুর্থ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। তেহরান সরকার সতর্ক করে বলেছে যে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, সম্পদ ও নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে। যেকোনো ধরনের বৈরী কর্মকাণ্ডের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে এবং এই ধরনের উসকানিমূলক আক্রমণের সম্পূর্ণ দায় ইউক্রেন সরকার ও তাদের পশ্চিমা সহযোগীদের ওপর বর্তাবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ইউক্রেনীয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কাস্পিয়ান সাগরে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ অভিযানের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। জেলেনস্কি অভিযোগ করেন যে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা বেশ কিছু জাহাজকে তারা দূরপাল্লার ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে যে আক্রান্ত জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র পরিবহনে জড়িত ছিল। এ ছাড়া কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থিত একটি রুশ যুদ্ধজাহাজেও তাদের ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট দাবি করেন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এই ঘটনা নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কেয়া কাল্লাসের সঙ্গে ফোনালাপে এই হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে ইউক্রেনের এই অবৈধ সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান কোনো পক্ষকে সামরিক সহায়তা দেয়নি এবং বেসামরিক বাণিজ্যকে যুদ্ধের আওতায় আনা আন্তর্জাতিক বিধিমালার মারাত্মক লঙ্ঘন।

দক্ষিণে পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য অনেকটাই কাস্পিয়ান সাগরের নিরাপদ নৌপথের ওপর নির্ভর করে আসছিল। কাস্পিয়ান সাগর দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ সামরিক ও বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, কিন্তু এই সাম্প্রতিক হামলার ফলে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের প্রবেশের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং পূর্ব ইউরোপের সংঘাতের পরিসর একসূত্রে গেঁথে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই আক্রমণ কাস্পিয়ান সাগরে নিয়মিত নৌ অভিযানে রূপ নেবে নাকি এটি কেবল ইরানকে অর্থনৈতিক ও সাময়িক চাপে ফেলার কৌশলগত চেষ্টা। সমুদ্র তীরবর্তী অন্যান্য দেশগুলো বিশেষ করে রাশিয়া ও আজারবাইজান তাদের আঞ্চলিক জলসীমার নিরাপত্তা রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর কাস্পিয়ান সাগরের ভবিষ্যৎ সামরিক স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমগ্র কাস্পিয়ান অঞ্চলে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

banner
Link copied!