ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রবিবার ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। নাবলুসের নিকটবর্তী একটি গ্রামে গোলাগুলির ঘটনায় চারজন ফিলিস্তিনি এবং দুজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার জের ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ব্যাপক তল্লাশি ও দমন অভিযানের নির্দেশ দেন। এই সামরিক অভিযানের সুযোগে উগ্রবাদী সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালায় এবং একাধিক মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোতে সেনা উপস্থিতি জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিটি প্রধান সড়ক ও প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তাচৌকি বসানো হয়েছে, যার ফলে সমগ্র অঞ্চলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
হামলার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে শনিবার গভীর রাতে এবং রবিবার ভোরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা নাবলুসের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুসরা শহরের নবনির্মিত আল-রহমা মসজিদে প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। কুসরা গ্রাম পরিষদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধি জানান যে উগ্রপন্থীরা মসজিদের দেয়ালে প্রতিশোধমূলক নানা উসকানিমূলক স্লোগান লিখে রেখে গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্বারা সত্যতা যাচাই করা একাধিক ভিডিওচিত্রে দেখা যায় যে আগুনের বিধ্বংসী শিখা পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণকে গ্রাস করে ফেলেছে। এছাড়া তুল কারেমের কাছে অবস্থিত কুর গ্রামেও তিনজন বসতি স্থাপনকারী আরেকটি মসজিদে আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালায়, তবে ভোররাতে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে আগুন মূল অংশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়।
পশ্চিম তীরজুড়ে পরিচালিত এই বিশাল সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী রামাল্লা, জেনিন, হেবরন, বেথলেহেম এবং তুল কারেমের শত শত বাড়িতে আকস্মিক নৈশ অভিযান চালিয়েছে। ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে যে প্রাথমিক সংঘর্ষের স্থান তাল গ্রাম থেকেই অন্তত ৩০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রামাল্লায় ১৪ জন, হেবরনে ৮ জন, তুল কারেমে ৬ জন, জেনিনে ৫ জন এবং বেথলেহেমে ৩ জনসহ পুরো ভূখণ্ড থেকে বহু ফিলিস্তিনি নাগরিককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া জেনিন শহরসহ সংলগ্ন জাবাবদেহ, ফাক্কুয়া, ইয়াবাদ, বুর্কিন, কাবাতিয়া, ইয়ামুন ও কাফর দানের মতো এক ডজনেরও বেশি গ্রামে সেনাবহর প্রবেশ করে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
অধিকৃত ভূখণ্ডে মানবাধিকার ও চিকিৎসাসেবার পরিস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে অবনতি ঘটেছে বলে ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানের সময় জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে তাদের অন্তত কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স প্যারামেডিক ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নাবলুসের রাফিডিয়া এবং হুওয়ারা এলাকায় উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনা ভিডিওচিত্রে ধারণ করা হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রধান প্রধান সড়কে যাতায়াতে কড়াকড়ি আরোপ করায় এবং একের পর এক প্রতিবন্ধক বসানোয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চলাচল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তেল আবিবে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে আয়োজিত সাম্প্রতিক প্রতিবাদ কর্মসূচির মাঝেও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন যাতে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। যা কম স্পষ্ট তা হলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর এই তীব্র পদাতিক অভিযান এবং বসতি স্থাপনকারীদের বেপরোয়া আক্রমণ কত দিন ধরে বজায় থাকবে কিংবা এর ফলে পুরো ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো বড় ধরনের প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠবে কি না। পশ্চিম তীরের সাধারণ মানুষ ও অধিকারকর্মীরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে অব্যাহত সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলবে।
