মানবদেহের কঙ্কালতন্ত্র বা হাড়ের ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে যা পরবর্তী জীবনে নানা জটিলতার সৃষ্টি করে বলে এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে বিবিসি হেলথ ও বোন হেলথ অ্যান্ড অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পুষ্টিবিদ এবং হাড় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে কেবল দুধ খাওয়ার ঐতিহ্যবাহী অভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনলে অস্টিওপোরোসিস এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ কোটিরও বেশি মানুষ অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ভঙ্গুরতা রোগে ভুগছেন যা বয়স্কদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
গবেষকদের মতে শৈশব ও কৈশোরকালে শরীরে হাড়ের যে রিজার্ভ বা সঞ্চয় তৈরি হয় তা মধ্যবয়সের পর কঙ্কালের শক্তিমত্তা নির্ধারণ করে। বয়স ত্রিশের কোঠা পার হওয়ার পর থেকেই হাড়ের ক্ষয় প্রক্রিয়া শুরু হতে থাকে যা অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই ভেতরে ভেতরে বৃদ্ধি পায়। ষাট বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে নিতম্বের হাড় ভাঙা অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে যা থেকে পরবর্তীতে ফুসফুসের প্রদাহ বা হৃদরোগের মতো জটিলতা দেখা দেয়। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত হ্রাস পায় তবে ইদানীং পুরুষেরাও এই সমস্যায় সমভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন।
হাড় সুরক্ষায় কেবল দুধ বা পনির নয় বরং আরও বেশ কিছু প্রাকৃতিক খাবার অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সোয়াবিন থেকে তৈরি টফু বা এডামামে বিনস ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস হিসেবে কাজ করে। এছাড়া তিল এবং চিয়া সিডে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস বিদ্যমান যা শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ক্যানজাত সার্ডিন ও সালমন মাছ ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি সরবরাহে বিশেষ ভূমিকা রাখে যা অন্ত্রে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে।
শুকনো ফল যেমন খেজুর, ডুমুর ও আলুবোখারা হাড়ের ক্ষয় ধীরে করার ক্ষেত্রে কার্যকর বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এসব ফলে থাকা পলিফেনল ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান কঙ্কালের সংযোগস্থল শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। তবে যা কম স্পষ্ট তা হলো, কেবল খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করে হাড়ের অস্টিওপোরোসিস সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যাবে কিনা যদি না এর সাথে নিয়ম মেনে শরীরচর্চা বা ভার বহনকারী ব্যায়াম যোগ করা হয়। পুষ্টিবিদরা স্পষ্ট করেছেন যে কঙ্কাল ও পেশি মূলত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। খাদ্যতালিকা থেকে পর্যাপ্ত উপাদান না পেলে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ নেওয়া যেতে পারে তবে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণ পতন ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ভেগান বা নিরামিষাশীদের ক্ষেত্রে উদ্ভিদজাত সুষম খাদ্য গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে কারণ প্রয়োজনীয় খনিজের অভাবে তাদের হাড় দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সামগ্রিকভাবে হাড় সুস্থ রাখতে প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ ও ফলমূল সমৃদ্ধ সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং সূর্যের আলো থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন ডি হাড়কে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে। যেকোনো ধরনের সম্পূরক খাদ্য গ্রহণের আগে শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।
