সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

কারাগারে অসুস্থ ঘানুচি, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বন্ধ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৭, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম

কারাগারে অসুস্থ ঘানুচি, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বন্ধ

তিউনিসিয়ার কারাবন্দী প্রবীণ বিরোধী নেতা ও দেশের সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার পঁচাশি বছর বয়সী রাশেদ ঘানুচি কারাগারে অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর টানা এগারো দিন ধরে তার পরিবার বা আইনজীবীদের দেখা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ের সতেরো তারিখে অতিরিক্ত গরমে তিনি কারাকক্ষে চেতনা হারিয়ে ফেলার পর তাকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও তার বর্তমান অবস্থান বা শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। ঘানুচির পুত্র মুয়াজ ঘানুচি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারি প্রসিকিউটরের কাছে কয়েক দফা লিখিত আবেদন করা সত্ত্বেও তাকে কোথায় রাখা হয়েছে বা তার শারীরিক অবস্থা কেমন তা জানাতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা এই পরিস্থিতিকে এক ধরণের জোরপূর্বক গুম হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভোগা এই বর্ষীয়ান নেতাকে তিউনিসিয়ার মর্নাগুইয়া কারাগারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণহীন কক্ষে তীব্র দাবদাহের মধ্যে রাখা হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে ওই এলাকার তাপমাত্রা বায়ান্ন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছিল যা একজন পঁচাশি বছর বয়সী মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। সরকারের এমন কঠোর ও অমানবিক আচরণের তীব্র সমালোচনা করে ঘানুচির পরিবার জানিয়েছে যে কেবল কারাগারে আটকে রাখাই শেষ কথা নয়, কর্তৃপক্ষ তাকে শারীরিকভাবে যন্ত্রণা দিয়ে আরও বেশি কষ্ট দিতে চাইছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও আন-নাহদা পার্টি এবং তার আইনি সুরক্ষা দল নিশ্চিত করেছে যে তারা নিশ্চিতভাবে জানেন না ঘানুচিকে রাজধানীর রাবতা পাবলিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে নাকি কোনো সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তার আইনজীবী দল এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অবিলম্বে তার শারীরিক অবস্থা এবং অবস্থান সম্পর্কিত স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের জন্য বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদের বিরোধী জোটের ওপর চলা কঠোর দমনপীড়নের অংশ হিসেবে দুই হাজার তেইশ সালের এপ্রিলে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

জাতিসংঘের আরবিট্রেটি ডিটেনশন সংক্রান্ত কার্যনির্বাহী দল আগেই রাশেদ ঘানুচির আটকাদেশকে সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করে তার অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছিল। তবে তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকার জাতিসংঘের সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি উপেক্ষা করে তাকে কঠোর পরিবেশে রেখে দিয়েছে। গত রবিবারে তিউনিসিয়ার প্রধান বিরোধী জোট ন্যাশনাল সালভেশন ফ্রন্ট সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা কোনো লুকোচুরি না করে তার স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা জাতিকে অবহিত করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও তীব্র তাপদাহের মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিদের সুরক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে রাষ্ট্রপতি কায়েস সাঈদ দুই হাজার একুশ সালে স্বৈরশাসন কায়েমের পর থেকে যেভাবে বিচার বিভাগ ও বিরোধী কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন, রাশেদ ঘানুচির ওপর চলমান অমানবিক আচরণ তারই এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের মুখে তিউনিসিয়ার সরকার এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের সুচিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে কিনা।

সারাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রবীণ ও অসুস্থ বন্দিদের জীবন বিপন্ন করার এই ঘটনা তিউনিসিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতিকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদি দেশটির সরকার অবিলম্বে বিরোধী নেতাদের সাথে অমানবিক আচরণ বন্ধ না করে এবং ঘানুচির স্বাস্থ্যের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান না করে, তবে আগামীতে তা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

banner
Link copied!