সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়

ইসরায়েলের টানা সামরিক অভিযানে উপত্যকাটির প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলেও ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে অভূতপূর্ব সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। দুই হাজার তেইশ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সামরিক হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ক্যাম্পাস, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, পাঠাগার ও শ্রেণীকক্ষগুলো প্রায় সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হয়। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার সব সুযোগ ভেঙে পড়লেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা বিকল্প উপায়ে শিক্ষা প্রক্রিয়া সচল রেখেছেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও ফিলিস্তিনের তরুণদের একটি দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়েই কাজ করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল রউফ আল-মানামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত সময়টিকে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসেই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান যে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অনুষদের ১৯টি প্রধান শিক্ষা ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫০০টি শ্রেণীকক্ষ, ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং ৭৫টি কম্পিউটার ল্যাব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পাঠাগারে থাকা আড়াই লাখের বেশি দুর্লভ বই, গবেষণা সাময়িকী ও একাডেমিক থিসিস আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বহু বছর ধরে সঞ্চিত চিকিৎসা প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম কয়েক দিনের ব্যবধানে নিখোঁজ বা ধ্বংস হয়ে যায়।

সামরিক হামলার তীব্রতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশিষ্ট ভবনগুলোতে আশ্রয় নেন। যার ফলে অক্ষত থাকা কয়েকটি প্রাঙ্গণও আশ্রয়শিবিরে পরিণত হয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট পথের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ চরম আকার ধারণ করলেও শিক্ষা বন্ধ হতে দেওয়া হয়নি। ইউনেস্কো ও ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে গাজার উচ্চশিক্ষার প্রায় শতভাগ অবকাঠামো কার্যক্রম চালানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও স্বাস্থ্যবিদ্যার মতো ব্যবহারিক নির্ভর বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।

বাস্তবমুখী ল্যাব সুবিধা না থাকায় চিকিৎসা অনুষদের শিক্ষকরা উদ্ভাবনী বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল সিমুলেশন, রেকর্ড করা ল্যাব পরীক্ষা ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ব্যবহারিক ক্লাসগুলো ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থী দীমা মুহাইসিন জানান যে দুই হাজার তেইশ সালের ডিসেম্বরে তাদের অনুষদ ভবন ধ্বংস হওয়ার পর স্থায়ীভাবে পড়ার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। ফলে তারা গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের ওয়ার্ডে কিংবা করিডোরে চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা চালান। তিনি দুই বছর ধরে উত্তর ও দক্ষিণ গাজার বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও অস্ত্রোপচার কক্ষে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

ল্যাব সমন্বয়কারী ইয়াসিন আল-নুনু জানিয়েছেন যে যুদ্ধের ঠিক কয়েক দিন আগে তাদের ল্যাবে এনাটমি মডেল, পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল ও সর্বাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই সব প্রযুক্তি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে একদমই অভিজ্ঞতাহীন না থাকে, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় চুক্তি করেছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে সরাসরি চিকিৎসকদের অধীনে গিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ইসরায়েলি অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও নতুন ল্যাব যন্ত্রপাতি আমদানি বন্ধ থাকায় কখন মূল ক্যাম্পাসে নিয়মিত ল্যাব ক্লাস শুরু করা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ঝুঁকি ও যাতায়াত ব্যবস্থার চরম অবনতির বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুরো গাজা উপত্যকাজুড়ে পাঁচটি শাখা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। যাতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা দূরবর্তী ভ্রমণে না গিয়ে নিকটবর্তী কেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষায় অংশ নিতে পারেন। এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে শক্তিশালী অনলাইন নেটওয়ার্ক এবং পুনর্গঠিত শিক্ষা পরিকল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন যে পাথর বা দালানকোঠা পুনর্নির্মাণের চেয়েও মানুষের মেধা ও দক্ষতাকে বাঁচিয়ে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধোত্তর গাজা গঠনে এই তরুণরাই মূল কারিগর হিসেবে কাজ করবেন।

দীর্ঘ অবরোধ ও বৈদেশিক আর্থিক সহায়তার ঘাটতি সত্ত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রত্যাশা করছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব হলেও নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা প্রক্রিয়া থামতে দেয়নি এই প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দীমা মুহাইসিনের মতে শিক্ষায় বিনিয়োগ করাই হলো পুনরুদ্ধারের আসল পথ। গাজার মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ইসলামিক ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষা সংগ্রাম প্রমাণ করে যে প্রতিকূলতার মুখেও একটি জাতির জ্ঞানের আলো নেভানো সম্ভব নয়।

banner
Link copied!