ইয়েমেনে চার বছরের আপেক্ষিক সামরিক বিরতি ও শান্তির আবহ শেষে আবারও এক পূর্ণাঙ্গ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে বলে রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। হুতি নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ও নতুন কৌশলগত পদক্ষেপ থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে দেশটি আবারও সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। লোহিত সাগরে সৌদি আরবমুখী দুটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মাধ্যমে এই উত্তেজনার পারদ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একই সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ধালে প্রদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর সাথে সরাসরি সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ত্রিশজন হতাহত হয়েছে।
গত এক দশকে হুতি বিদ্রোহীরা একাধিক আন্তর্জাতিক শক্তি এবং আঞ্চলিক সামরিক জোটের সাথে লড়াই করে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে রাজধানী সানআসহ জনবহুল এলাকাগুলো উদ্ধার করা যায়নি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অব্যাহত বিমান হামলা সত্ত্বেও হুতিরা তাদের মূল সামরিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিল। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন যে বিগত চার বছরে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আসন্ন নতুন যুদ্ধ হুতিদের জন্য অতীতের মতো সহজ হবে না।
২০১৪ সালে যখন হুতিরা সানআ দখল করে তখন সরকারি দলগুলো ছিল চরমভাবে বিভক্ত। দেশটির প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাব্বু মানসুর হাদি প্রাণভয়ে পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটানোর পর ইয়েমেন সরকারি ক্যাম্পে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছে। গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনীকে ইয়েমেন থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর বর্তমানে সৌদি আরব এককভাবে সরকারি বাহিনী ও স্থানীয় সশস্ত্র দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করছে।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত এবং তাদের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একক কেন্দ্রে পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজধানী সানআর পূর্বে আল-জাউফ অঞ্চলে হুতিদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী উপজাতি নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। উপজাতীয় ঐক্যের এই নতুন মেরুকরণ হুতিদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতদিন পর্যন্ত হুতিরা যে রাজনৈতিক বা সামরিক একক আধিপত্য ভোগ করে আসছিল তা এখন স্থানীয় ও জাতীয় উপজাতীয় প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলার কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোটেও পরিবর্তন আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে লোহিত সাগরে মুক্ত নৌ চলাচল ব্যাহত হলে ইয়েমেনের প্রধান চালিকাশক্তির ওপর চরম সামরিক আঘাত হানা হবে। মার্কিন প্রশাসন থেকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে যে হুতিদের নতুন কোনো সামরিক অভিযানের দায় সরাসরি তেহরানের ওপর বর্তাবে। স্থানীয় ভূমিসেনাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে একযোগে বিভিন্ন ফ্রন্টে নামানোর প্রস্তুতি চলছে যা হুতিদের একই সাথে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে।
অবশ্য হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের অনুগত প্রায় দুই লাখ নিয়মিত যোদ্ধা রয়েছে। তাদের কাছে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক ড্রোন এবং পর্বতঘেরা অঞ্চলের শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি। তবে যা কম স্পষ্ট তা হলো, ইয়েমেন সরকার এবং তাদের মিত্ররা আঞ্চলিক সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কত দ্রুত ভূমিভিত্তিক অভিযান শুরু করতে পারে। বিরোধী দলগুলোর এই রাজনৈতিক ও সামরিক রূপান্তর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে কতটা বড় প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত হতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এবার যদি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয় তবে তা কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চার দিক থেকে একযোগে পদাতিক বাহিনীর আক্রমণ আসবে যা হুতিদের একক শাসনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। দীর্ঘ বছরের অবরুদ্ধ জীবন এবং অর্থনৈতিক মন্দায় বিপর্যস্ত ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ নতুন এই যুদ্ধের আশঙ্কায় চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশ্ব সম্প্রদায় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে কারণ লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
