দখলকৃত পশ্চিম তীরের পৃথক দুটি গ্রামে রোববার ভোরে অন্তত দুটি মসজিদে আগুন দিয়েছে সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বলে আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করেছে। নাবলুস জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের কুসরা গ্রামে অবস্থিত আল-রহমা মসজিদ এবং তুলকারেমের নিকটবর্তী কুর গ্রামের আরেকটি মসজিদে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালে হিব্রু ভাষায় "প্রতিশোধ" সহ একাধিক জাতিগত বিদ্বেষমূলক গ্রাফিতি এঁকে পালিয়ে যায়। ফিলিস্তিনের ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে রাতের আঁধারে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও জাতিসংঘের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে কেবল গত এক বছরেই পশ্চিম তীর জুড়ে অন্তত পঁয়তাল্লিশটি মসজিদে হামলা বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে বেআইনি বসতি স্থাপনকারীরা। সাম্প্রতিক এই হামলার ঠিক দুদিন আগে নাবলুস সংলগ্ন তাল গ্রামে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের সাথে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। ওই ঘটনায় চার ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। এরপরই মূলত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বনাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় অবরুদ্ধ মসজিদগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো চরম ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলোর পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো নিজেদের ঘরবাড়ি সুরক্ষায় পাহারা জোরদার করেছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় বা ওসিএইচএ এর সংগৃহীত উপাত্ত প্রকাশ করে জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পশ্চিম তীরে মোট তিন হাজার ৩৩টি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ভৌগোলিক বিচারে রামান্নাহ ও আল-বিরহ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আটশ একাশিটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর পরপরই নাবলুসে ছয়শ ষাটটি এবং হেব্রনে চারশ সাতানব্বইটি সহিংস ঘটনা রেকর্ড করা হয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে ভূমি দখলের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। ২০২৫ সালে মাসে গড়ে একশ তিপ্পান্নটি হামলা নথিভুক্ত হলেও ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে এই গড় বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০টিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। প্রতিটি প্রশাসনিক অঞ্চলেই ফিলিস্তিনিদের ওপর দৈনন্দিন সহিংসতা বাড়ছে এবং তারা নিজস্ব জমিতে কৃষিকাজ বা গবাদিপশু চড়াতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনঘাতী হামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপস্থিতিতেই বসতি স্থাপনকারীরা এই হামলা পরিচালনা করে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও ১৯৬৭ সালের পর থেকে ইসরায়েল এসব বসতি সম্প্রসারণ করে চলেছে। বর্তমানে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় আড়াইশটি অবৈধ বসতিতে ছয় লাখ থেকে সাড়ে সাত লাখ ইসরায়েলি নাগরিক বসবাস করছে, যা ইসরায়েলের মোট ইহুদি জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। এই আন্তর্জাতিক অমান্যতার মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেশটির দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার পর থেকে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মৌলিক শর্তাবলীকে তোয়াক্কা না করে বসতি সম্প্রসারণ নীতি অব্যাহত রেখেছেন। চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিম তীরের জমির মালিকানা নিবন্ধনের নতুন আইন পাস করে ফিলিস্তিনিদের জমি কেড়ে নেওয়ার আইনি পথ আরও সহজ করা হয়েছে।
হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার কেবল এই সহিংসতার কারণে নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। ওসিএইচএ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত এক হাজার ৯৮৮ জন ফিলিস্তিনি নিজ গৃহ থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের মোট বাস্তুচ্যুতির সংখ্যার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে রামান্নাহ, জেরিকো এবং তুবাস অঞ্চলের যাযাবর ও কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলো বসতি স্থাপনকারীদের অস্ত্রের মুখে জমি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। গৃহহীন পরিবারগুলো নিকটস্থ উপত্যকা বা অন্য এলাকায় গিয়ে কোনো মতে প্লাস্টিক ও তাঁবুর ছাউনিতে দিন কাটাচ্ছে।
পশ্চিম তীরের এই ভূমি দখল ও ধ্বংসযজ্ঞের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে তথাকথিত `এরিয়া সি` অঞ্চলে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি অনুযায়ী পুরো পশ্চিম তীরকে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল— এরিয়া এ, এরিয়া বি এবং এরিয়া সি। এরিয়া সি পশ্চিম তীরের মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ দখল করে আছে, যেখানে সিভিল ও সামরিক উভয় নিয়ন্ত্রণই ধরে রেখেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। যদিও এই এলাকায় প্রায় তিন লাখ ফিলিস্তিনি বাস করেন, কিন্তু ইসরায়েলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তাদের কোনো বাড়িঘর বা অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন দেয় না। ফলে তৈরি হওয়া বেশিরভাগ স্থাপনাকে অবৈধ ঘোষণা করে ইসরায়েলি বাহিনী ভেঙে ফেলে এবং ফাঁকা জায়গায় নতুন করে অবৈধ বসতি গড়ে তোলে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েল সরকার বসতি স্থাপনকারীদের অবাধ তাণ্ডব বন্ধে বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে হামলাকারী সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক বিচার না হওয়ায় তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের ভিটেমাটি এবং ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ দাবি করে আসছে। যদি এই সহিংসতা নিরসন করা না যায়, তবে পুরো অঞ্চলটি একটি নতুন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
