বিশ্বের প্রাচীনতম এবং ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট উইম্বলডন ক্রিকেটপ্রেমী দেশ ভারতে তাদের দর্শকসংখ্যা বাড়াতে প্রচলিত ঐতিহ্য ভেঙে নতুন ও ভিন্নধর্মী কৌশল গ্রহণ করেছে বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। খেলোয়াড়দের সম্পূর্ণ সাদা পোশাকের কঠোর নিয়ম, ঐতিহ্যবাহী স্ট্রবেরি ও ক্রিমের পরিবেশনা এবং সীমিত বিজ্ঞাপনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই টুর্নামেন্টটি এবার ভারতীয় বাজারের সঙ্গে নিজেদের মেলবন্ধন তৈরি করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত এমন একটি দেশে টেনিস খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে এই অভিনব প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে যেখানে ক্রিকেটই প্রধান খেলা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঐতিহ্যবাহী স্ট্রবেরি ও ক্রিমের সঙ্গে ভারতীয় কুলের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দিল্লির একটি প্রাচীন কুলফি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ। রজার ফেদেরার ও অন্যান্য টেনিস তারকাদের নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় বলিউড গানের তালে কোর্টে পারফর্ম করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সেলিব্রিটি ক্রিকেটার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাজকীয় বক্সে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের তারকা খ্যাতির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে খেলাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল কন্টেন্টের মাধ্যমে বিপণন কার্যক্রমকে আরও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই বহুমুখী প্রচারণার সুফলও পাওয়া শুরু হয়েছে এবং পুরুষদের ফাইনালে ইয়ানিক সিনারের জয় স্থানীয় সময় মধ্যরাতের পরেও ভারতে প্রায় সতেরো লাখ লাইভস্ট্রিম দর্শক আকর্ষণ করেছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে এই বছর টুর্নামেন্টটি দেখতে গড়ে আট লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার দর্শক যুক্ত হয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় আঠারো শতাংশ বেশি। টুর্নামেন্টের সম্প্রচারস্বত্ব ধারণকারী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ না করলেও সামগ্রিক দর্শকপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
খেলাধুলার ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ দর্শনা ভল্লার মতে উইম্বলডনের এই ভারতমুখী উদ্যোগ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় বরং এটি একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদীয়মান প্রতিভার উপস্থিতি এবং প্রিমিয়াম শহুরে ক্রীড়া ব্যবহারের প্রসার বৃদ্ধির কারণে ভারতের বাজার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অল ইংল্যান্ড লন টেনিস ক্লাবের প্রধান নির্বাহী স্যালি বোল্টন ইতিপূর্বে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতও তাদের গ্র্যান্ড স্ল্যামের দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধির একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তরুণ ভারতীয়দের কাছে উইম্বলডন যাতে কেবল একটি অভিজাত বা দূরবর্তী আয়োজন না হয়ে নিজেদের সংস্কৃতির কাছাকাছি মনে হয়, সেই সাংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিপণন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে আধুনিক যুগে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমেই বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয় এবং এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই উইম্বলডন সরাসরি তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সম্প্রচার প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন দর্শক শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে পারছে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনদাতারাও ক্রিকেট ছাড়াও অন্যান্য প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির ক্রেতাদের নাগাল পাচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততা তৈরি করতে হলে কেবল এককালীন প্রচারণামূলক কৌশল দিয়ে কাজ হবে না বরং তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তবে বর্তমান এই অভিনব পরীক্ষামূলক উদ্যোগ যদি সফল হয় তবে ফুটবল, ফর্মুলা ওয়ান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাও ভারতে তাদের দর্শক বাড়ানোর কৌশল আরও জোরদার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
